মাদারীপুরে তিনজনের লাশ উদ্ধার: স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা, বলছে পুলিশ

লাশপ্রতীকী ছবি

মাদারীপুরে সৎমায়ের ভাড়া বাসা থেকে এক দম্পতি ও তাঁদের শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, মানসিক বিপর্যয়ের কারণে স্বামী প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করেন। পরে তিনি নিজে আত্মহত্যা করেন।

আজ মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে মাদারীপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে গত রোববার রাত আড়াইটার দিকে মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকা থেকে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকার যতীন শিকদারের ছেলে চিন্ময় শিকদার (২৮), তাঁর স্ত্রী ইশা শিকদার ওরফে ইশরাত জাহান (২২) এবং তাঁদের আট মাস বয়সী মেয়ে জেনি।

চিন্ময়ের বাবা যতীন শিকদারকে ইতালিপ্রবাসী বলা হলেও পুলিশ তা ভুয়া বলে দাবি করেছে। পুলিশের ভাষ্য, যতীন শিকদার পেশায় ওঝা এবং একটি অপহরণ মামলার পলাতক আসামি। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিষ্টি শিকদার ওরফে মিষ্টি আক্তার (২৪) তিন বছর ধরে মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেলে চিন্ময় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সৎমা মিষ্টির ভাড়া বাসায় ওঠেন। পরে সন্ধ্যায় মিষ্টি বাজার করতে বাসা থেকে বের হন। রাত ৯টার দিকে তিনি ফিরে এসে চিন্ময় ও তাঁর স্ত্রীকে ডাকাডাকি করেন। দুই ঘণ্টার বেশি সময় কোনো সাড়া না পেয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। রাত ২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। এ সময় চিন্ময় ও তাঁর শিশুকন্যাকে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এবং তাঁর স্ত্রী ইশাকে বিছানায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে পুলিশ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

আরও পড়ুন

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আমরা প্রাথমিকভাবে রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছি। প্রথমে চিন্ময় তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেন। কারণ, চিন্ময় তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে খুবই ডিপ্রেশনে ছিল। তাঁর ফোনে আমরা কিছু কনভারসেশন দেখেছি। তাঁর স্ত্রীর পেছনে চিন্ময় ১৪ লাখ টাকা খরচ করেছেন। তারপর তাঁর স্ত্রী আইসিইউতেও ছিলেন। চিন্ময় কিছুই করতেন না। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। এখানে চিন্ময়ের স্ত্রী ইশা এবং তাঁর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী মিষ্টি দুজনই ধর্মান্তিত হয়েছেন। এ কারণে পরিবার তাঁদের ত্যাজ্য করেছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, মিষ্টির সংসার চালাতে টাকাপয়সা দরকার হলে তিনি তাঁর স্বামীর বড় ছেলে চিন্ময়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। এখানে মিষ্টির সঙ্গে চিন্ময়ের কোনো অনৈতিক সম্পর্ক নেই। চিন্ময় তাঁর স্ত্রীকে নিয়েই খুব ঝামেলার মধ্যে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জটিল কিছু রোগে ভুগছিলেন। গত বুধবার তাঁরা ঢাকা থেকে চিকিৎসা নিয়ে মাদারীপুরে আসেন। চিন্ময় নিজেও তাঁর বাবা ও ছোট ভাই জয়ের সঙ্গে একটি অপহরণ মামলায় আসামি। তাই তিনি গ্রেপ্তারের ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকতেন না।

পুলিশ জানায়, ইশা শিকদার তিন বছর আগে ধর্মান্তরিত হন। তাঁর আগের নাম ছিল ইশরাত জাহান। তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার এরশাদ মিয়া ও শিউলি বেগম দম্পতির মেয়ে। চিন্ময়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। অন্যদিকে মিষ্টি শিকদারও ধর্মান্তরিত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তাঁর বাবার বাড়ি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার কাজিবাকাই ইউনিয়নের পশ্চিম মাইজপাড়া এলাকায়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চিন্ময়ের সৎমা মিষ্টিকে আটক করেছে পুলিশ।