আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালুখালী আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-১১) ৩২ হাজার ২০০ রোহিঙ্গার বাস। ৫ মার্চের এ অগ্নিকাণ্ডে পুড়েছে রোহিঙ্গাদের ২ হাজার ৮০৫টি ঘর। এতে গৃহহীন হয়েছেন ১৫ হাজার ৯২৬ রোহিঙ্গা। এ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা প্রথম আলোকে বলেন, আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ত্রিপল, বাঁশসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছে আইওএম। তাঁরা এসব দিয়ে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করছেন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ‘ডব্লিউএফপি’ ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে সকালে বিস্কুট এবং দুপুর ও রাতে রান্না করা খাবার দিচ্ছে। পরে তাঁদের স্থায়ী ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে।

সাড়ে পাঁচ বছর আগে কয়েকটি উঁচু পাহাড় কেটে বালুখালী আশ্রয়শিবিরটি গড়ে তোলা হয়েছিল। বেশির ভাগ ঘর পাহাড়ের ঢালুতে। অল্প কিছু ঘর দুই পাহাড়ের মধ্যভাগের সমতলে। ৫ মার্চের অগ্নিকাণ্ডে অধিকাংশ ঘর পুড়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপে অসংখ্য সাদা ত্রিপলের ঘর উঠেছে। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে ত্রিপলের ছাউনির নিচে থাকতে শুরু করেছে বহু রোহিঙ্গা পরিবার। এসব পরিবারের নারী সদস্যদের খোলামেলা পরিবেশে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে অনেকে বাঁশ দিয়ে ঘরের চারদিকে পলিথিনের বেড়া ও ছাউনি দিচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তাঁবু খাটিয়ে পৃথক দুটি বড় ঘর তৈরি করা হয়েছে, সেখানে রান্নাসহ প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন ডব্লিউএফপির লোকজন।

অগ্নিকাণ্ডে ক্যাম্প-১১ আশ্রয়শিবিরের ডি ব্লকের অন্তত ৭৬০টি ঘর পুড়েছে। পাঁচ দিনের মাথায় ৫০০ পরিবার ধ্বংসস্তূপের ওপর সাদা ত্রিপলের ছাউনি টানিয়ে বসবাস শুরু করেছে। তবে যারা ত্রিপল পায়নি, সেসব পরিবারকে থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। অনেকে আশপাশের আশ্রয়শিবিরে আত্মীয়স্বজনের ঘরে অবস্থান করছেন। কয়েকটি পরিবারকে বাঁশ-বেত দিয়ে ঘর তৈরি করতে দেখা গেছে।

ডি ব্লকের পশ্চিম পাশে বাঁশের চালা দিয়ে ঘর তৈরি করছিলেন রোহিঙ্গা কামাল হোসেন (৪৫)। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করছেন আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা। কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আগুনে তাঁর ঘরটিও পুড়ে যায়। পরিবারের সবাই এক কাপড়ে ঘর থেকে পালিয়ে বাঁচেন। ৮ মার্চ আইওএমের কর্মীরা একটি ত্রিপল এবং কয়েকটি বাঁশ ও রশি দিয়েছেন। গরমে ত্রিপলের ছাউনির নিচে থাকা যায় না। তা ছাড়া ঘরের নারী সদস্যদের খোলামেলা পরিবেশে রাত কাটাতে সমস্যা হচ্ছে। তাই ধার করা টাকায় বাঁশ কিনে ঘরের চালা ও বেড়া লাগাচ্ছেন।

ডি ব্লকের দক্ষিণ কোনায় তিন দিন ধরে ত্রিপলের নিচে অবস্থান করছেন রহিমা বেগম (৪২)। সঙ্গে এক কিশোরী মেয়ে ও দুই ছেলে। রহিমা বলেন, দুপুর ও রাতের বেলায় তাঁদের প্যাকেট করা খাবার দেওয়া হচ্ছে। প্যাকেটে থাকে ভাত, সবজি, ডাল। এসব খেতে অভ্যস্ত নন তাঁরা। মাঝেমধ্যে মাছ-মাংস দিলে ভালো হতো।

আশ্রয়শিবিরের এ ও বি ব্লকের অবস্থাও একই রকম। ধ্বংসস্তূপের ওপর সাদা ত্রিপলের ছাউনি টানিয়ে থাকতে শুরু করেছে কয়েক শ রোহিঙ্গা পরিবার। এ, বি ও ডি—এই তিন ব্লকে অন্তত ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবার এখনো খোলা আকাশের নিচে। কমবেশি সবাই গৃহনির্মাণসামগ্রী পেলেও অনেকেই ঘর তৈরি করছেন না।

এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেন রোহিঙ্গা আবদুল মজিদ (৪৭)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন আগে থেকেই জানাজানি হয়, ক্যাম্পে আগুন লাগানো হবে। তাঁরা সতর্ক ছিলেন বলেই হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওই দিন বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে ঘরে আগুন লাগাতে দেখেছেন তাঁরা। আগুন লাগার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।