নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে

রাজশাহীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে জনসভায় ভাষণ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।ছবি: প্রথম আলো

নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল ভেতরে–ভেতরে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। নিশিরাতের নির্বাচন দেখেছি। আমি-ডামি নির্বাচন দেখেছি। গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। পেরেছিলেন আপনারা? পারেননি আপনারা ভোট দিতে। তারা চলে গেছে, যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করছে, ভেতরে–ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে—কীভাবে নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, বাধাগ্রস্ত করা যায়।’

আগামী নির্বাচন যেন কেউ বানচাল করতে না পারে, সে জন্য সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান।

তারেক রহমান বেলা ২টা ৩০ মিনিটে জনসভায় ভাষণ শুরু করেন। দীর্ঘ ২২ বছর পর রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে তাঁর ‘আত্মার সম্পর্ক’ রয়েছে। তখন নিচ থেকে নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দ জানান।

রাজশাহীতে আইটি পার্ক সচল করে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তোলা হবে বলে জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি তিনি রাজশাহীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প সচল করার প্রতিশ্রুতি দেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।

২৫ মিনিটের ভাষণে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘অন্য জেলার মানুষের রাজশাহীর কথা মনে আসলে প্রথমে মনে আসে পদ্মা নদীর কথা। কিন্তু নদী থাকলেই তো হবে না, নদীতে পানি থাকতে হবে। আবার রাজশাহীর কথা মনে আসলে শিক্ষা নগরীর কথা মনে আসে। এখানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে; উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছে। কিন্তু সেই মানুষের কর্মসংস্থান নাই। এখানে আইটি ভিলেজ আছে, কাজ নাই। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল। সেটি এখন বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে জয় হলে আমরা পদ্মা ব্যারেজে হাত দিতে চাই। আইটি ভিলেজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিএমডিএকে সচল করতে চাই। সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই।’

সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ। সঞ্চলনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক মাফজুর রহমান। আজ সকাল ১০ থেকে স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজ রাজশাহী হজরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বেলা সোয়া ১টার দিকে তিনি হজরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর দরগা শরিফে যান। পৌনে ২টার দিকে তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় আসেন। স্থানীয়ভাবে এটি ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান হিসেবে পরিচিত।

জনসভায় উপস্থিত নেতা–কর্মীরা। আজ হাজী মোহাম্মদ মহসিন সরকারি বিদ্যালয় মাঠে।
ছবি: শহীদুল ইসলাম

তারেক রহমান জনসভায় বলেন, ‘২০০৪ সালে আমি রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় গিয়েছিলাম। শীতের সময় কম্বল বিতরণ করেছি, গরমের সময় নারী ও দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য ছাগল বিতরণ করেছি। সেই থেকেই রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক রয়ে গেছে।’

কৃষকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রত্যেক কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। এ কথা বলার পর তিনি দর্শকদের কাছ থেকে উত্তর জানতে চান, এতে চলবে? তখন সবাই করতালি দিয়ে তাঁকেসমর্থন জানান।

নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, দলমত–নির্বিশেষে প্রত্যেক মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা সংসারের ন্যূনতম ব্যয় সামাল দিতে পারেন। কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে আইটি পার্ক থাকলেও তা কার্যত অচল। আমরা আইটি পার্ক সচল করব, প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তুলব।’ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে রাজশাহীতে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, দেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভেতরেই থাকবে।

আরও পড়ুন

মঞ্চের পাশে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট দেশে যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তন যাতে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করে, দেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, তাঁদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেই জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।’ গত ১৬- ১৭ বছরে ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নিশিরাতের নির্বাচন, গায়েবি নির্বাচন আমরা দেখেছি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র থাকলেই জনগণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।। আমরা ধর্ম নয়, মানুষ দেখি।  ১৯৭১ সালে আপনারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তখন ধর্ম দেখি নাই। এখন দেশ গড়ার সময় আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাইকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’

বিএনপির প্রার্থীদের হাতে দলের প্রতীক ধানের শীষ তুলে দেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান
ছবি: প্রথম আলো

আগামী নির্বাচন সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। নিশিরাতের নির্বাচন দেখেছি, ডামি নির্বাচন দেখেছি, গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা চলে গেছে। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে কীভাবে এই নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়। আগামী ১২ তারিখের (ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন যেন কেউ বানচাল করতে না পারে, সে জন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। সকলকে সজাগ থাকতে হবে। জনগণ যদি ১২ তারিখে সতর্ক-সজাগ থাকে, ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন। জনগণের প্রত্যাশা, আশা, আকাঙ্ক্ষা যে সকল আছে, সে বিষয়ে কাজগুলো ধীরে ধীরে শুরু হবে। ধানের শীষ বিজয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকেই শুরু হবে জনগণের জয়যাত্রা।’

যেকোনো বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সঠিক তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ-বিবাদে যেতে চাই না। যেতে চাই না বলেই আজ এখানে দাঁড়িয়ে আমি কারও সমালোচনা করছি না। কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে তাদের বলব, সঠিক-সুষ্ঠু তদন্ত করুন। সেই তদন্তে যদি বিএনপির কোনো ভূমিকা থাকে, আমরা সহায়তা করব। কিন্তু সঠিক তদন্ত হতে হবে। সঠিক তদন্ত অনুযায়ী দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে, যদি কোথাও কোনো সমস্যা হয়ে থাকে।’

মেগা দুর্নীতির উদ্দেশ্যে অতীতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬-১৭ বছর এই দেশের ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তেমনি মেগা মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মেগা দুর্নীতি। এলাকার মানুষের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষক ঠিকমতো পাঠানো, ডাক্তার ঠিকমতো পাঠানো-এগুলো কোনো কাজ ঠিকমতো করা হয়নি।’

বক্তব্য শেষে তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধানের শীষের ১৩ প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজ হলো আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এদের দেখে রাখা। ১৩ তারিখ থেকে এরা আপনাদের দেখে রাখবে।’