রোগীদের পর পালিয়েছেন মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকেরাও, অপমৃত্যুর মামলা

একজনের মৃত্যুর ঘটনার জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে গতকাল বুধবার একসঙ্গে ৪০ জন পালিয়ে যানছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র ‘প্রয়াসে’ এক রোগীর মৃত্যু ও ভাঙচুরের ঘটনার জেরে চিকিৎসাধীন সব রোগীর পালিয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রের পরিচালকেরাও পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে যাওয়া রোগীদের কোনো খোঁজখবর জানে না কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে নিরাময় কেন্দ্রটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে।

নিরাময় কেন্দ্রের এক পরিচালকের দাবি, রোগীদের পালিয়ে যাওয়াসহ ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। তবে পুলিশের ভাষ্য, নিরাময় কেন্দ্র কোনো জিডি করেনি। শুধু রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

মারা যাওয়া রোগীর স্বজনেরা বলছেন, নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকেরা পুলিশ ও প্রশাসনকে প্রভাবিত করায় তাঁরা হত্যার অভিযোগে আদালতে মামলা করবেন।

আরও পড়ুন

এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে সেখানে চিকিৎসাধীন মো. ফোরকান (২৯) নামের এক রোগীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন দুপুরে এলাকার লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালালে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা ৪০ জন রোগী একসঙ্গে পালিয়ে যান। তবে পরিচালকদের ভাষ্য, ফোরকান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পরিবার মিথ্যা অভিযোগ তুলছে।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়া চারজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, তাঁরা সবাই ভয়ে পালিয়ে এসেছেন। তাঁদেরও নির্যাতন করা হতো। ফোরকান নির্যাতনের শিকার হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। পালানোর আগে তাঁদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো মনোরোগবিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও নার্স নেই বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।

যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক প্রমোদ বর্মণ প্রথম আলোকে বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মূল মালিক ইকরামুল হক ওরফে রুবেল। রোগীদের পালিয়ে যাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা থানায় একটি জিডি করা হয়েছে বলে শুনেছেন। তাঁরা কেউই এখন নিরাময় কেন্দ্রে নেই। স্থানীয় লোকজন ভাঙচুর চালালে তাঁরা সেখান থেকে সরে আসেন। পালিয়ে যাওয়া রোগীদের তথ্য তাঁদের কাছে নেই।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে মাদক নিরাময় কেন্দ্র প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইকরামুল হক ওরফে রুবেলের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করলেও না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা অভিযোগ দেওয়া হয়নি। রোগীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের কেউ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি।

নিহত ফোরকানের ভগ্নিপতি ইমন হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন রোগীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে। তাঁরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের দিয়েছেন। নির্যাতনের পর কোনো চিকিৎসা না দিয়েই তাঁর শ্যালককে হত্যা করা হয়েছে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের ফোরকানের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এমন বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলেছেন।’ তাঁর দাবি, প্রয়াসের পরিচালকেরা প্রভাবশালী। তাঁরা সবাই পুলিশ ও প্রশাসনকে প্রভাবিত করছেন। এ জন্য তাঁরা আদালতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গতকাল বৃহস্পতিবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের জানালা ভাঙা। এ জন্য আমাদের লোকজন সেখানে আছেন। জানালা মেরামতের পর তত্ত্বাবধান নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

রোগীদের প্রভাবিত করার অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক বলেন, ‘আমরা আগে সেখানে যাইনি। পালিয়ে যাওয়ার রোগীরা এসব এমনি বলছেন। আমাদের লোকজন এর সঙ্গে জড়িত নন। আর নিরাময় কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম করে থাকলে তাদের লাইসেন্স বাতিল হবে। ফোরকানের মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের তদন্তে বিচার হবে।’

এর আগে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ আছে ওই নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।