রাউজানে আবার প্রকাশ্যে খুন, পুলিশকেই ‘চ্যালেঞ্জ’ সন্ত্রাসীর
সর্বশেষ গুলি করে হত্যা করা হয় এক যুবদল কর্মীকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
‘ওয়েট অ্যান্ড সি’—পুলিশের উদ্দেশে গত ২০ আগস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এমন হুমকি দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানের সন্ত্রাসী মো. রায়হান। চার দিন পর আরেক পোস্টে অনুসারীদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ছোট ভাইয়েরা সবাই রেডি হও। রাউজানে কার কার ঘরে ভাঙচুর করা লাগবে লিস্ট করো।’
হুমকির ১০ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় রাউজানের কেরানীহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মোহাম্মদ করিম (৩৫) নামের এক যুবদল কর্মীকে। একদল অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁকে কুপিয়ে ও গুলি করে চলে যায়। আতঙ্কে প্রায় এক ঘণ্টা সড়কের ওপর পড়ে থাকা লাশটি সরিয়ে নেওয়ার সাহসও পাননি স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় ঘণ্টা পর গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে নিজের ফেসবুকের স্টোরিতে গুলি ছোড়ার ভিডিও আপলোড করেন রায়হান। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের ভাষ্য, সন্ত্রাসী রায়হান পুলিশকে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দিচ্ছেন।
গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানের সময় একটি বাসার ছাদ থেকে রায়হান পালিয়ে যান বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। রায়হানকে ধরতে পুলিশ ব্যর্থ হলেও তাঁর প্রকাশ্য হুমকি এবং রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সন্ত্রাসীদের চলাচল ও সংঘবদ্ধ হওয়ার আগাম তথ্য পাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মো. নাজিমুল হক বলেন, রাউজান ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন সদস্য রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা বসানো এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির প্রস্তাব করা রয়েছে। রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদের টহলেও রাখার কথা বলা হয়েছে।
রায়হান বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার ঘটনায়ও রায়হানের নির্দেশের কথা মামলার আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। কিন্তু এখনো তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
করিমকে যেভাবে হত্যা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে করিম কেরানীহাট বাজারে ঢোকার সময় চার–পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে আসা একদল অস্ত্রধারী তাঁকে ঘিরে ফেলে। একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় কোপ দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন গুলি ছোড়ে। মৃত্যু নিশ্চিত করে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হামলাকারীরা।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করিমের পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলি লাগে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। এ ছাড়া তাঁর ঘাড় ও কপালে কোপের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ জানায়, করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা ছিল। তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন।
করিমের পরিবার হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকায় থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন করিম। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় বিদেশে যান। দেশে ফেরার পর মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ।
করিমের স্ত্রী বিলকিস আকতার প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরে করিমকে গ্রামের একটি বৈঠকে বসার জন্য কয়েকজন সন্ত্রাসী ফোন করে ডাকছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। রাতে তাঁকে গুলি করে হত্যার খবর পান তাঁরা।
আগাম ব্যবস্থা কেন নয়
রাউজানে একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পরও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা নিতে না পারা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাচল করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে, এরপরও তাদের অবস্থান ও গতিবিধি শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রাউজানের সব কটি হত্যাকাণ্ডে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। রায়হানসহ অন্য জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে অভিযান চলছে। সম্প্রতি জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসীদের ওপরও পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে করিম হত্যার পেছনে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান পুলিশ সুপার। তাঁর ভাষ্য, মাদকের বিরোধকে কেন্দ্র করে করিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য ও সোর্সব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সোর্স মানি যথাসময়ে দিতে হবে। পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।