শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের জন্য ছাত্রশিবির নিজেদের ‘ত্যাগী’ নেতা-কর্মীর পাশাপাশি সাবেক একজন সমন্বয়ককে শীর্ষ পদে ও আরকজনকে সম্পাদকীয় পদে প্রার্থী করেছে। ছাত্রশিবিরের ঘোষিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলে আছেন নারী প্রার্থী; পাশাপাশি সংগঠনের বাইরে ক্রীড়া সম্পাদক পদেও একজন খেলোয়াড়কে প্রার্থী করা হয়েছে।
২০ জানুয়ারি শাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে। ছাত্রশিবির ৭ ডিসেম্বর প্যানেল ঘোষণা করেছে। তাদের প্যানেলে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক দেলোয়ার হাসান (শিশির)। আগে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ না করলেও বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় তিনি সংগঠনটির ‘সাবেক সদস্য’ পর্যায়ের জনশক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। এই প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে লড়ছেন ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম। ২০২৩ সালে তিনি সংগঠনের একটি পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
অন্যদিকে সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে সংগঠনটির মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক মো. শাকিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্টুডেন্ট এইড সাস্ট’–এর পরিচালক। এজিএস পদে আগে একই প্যানেল থেকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আজাদ শিকদার প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও পরে তাঁকে সমাজসেবা পদে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক সমন্বয়ক।
ছাত্রশিবির বলছে, সংগঠনের বাইরের ‘যোগ্য’ শিক্ষার্থীদের প্রার্থী করেছে তারা। এ বৈচিত্র্যই তাদের প্যানেলকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে অপ্রকাশ্যে মেসে মেসে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাত ছাত্রশিবির। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সংগঠনটির সদস্যরা নিজেদের পরিচয় সামনে আনতে থাকেন। তখনই জানা যায়, সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের অনেকেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন।
প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদে লড়ছেন মাহাবুব হোসেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। এ ছাড়া সাহিত্য ও বার্ষিকী সম্পাদক প্রার্থী তামিম রেজওয়ানের ছাত্রশিবিরে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আগে প্রকাশ্যে কেউ জানতেন না। সর্বশেষ প্যানেল ঘোষণার দিন সবাই জানতে পারেন, তিনি শিবিরের ‘সাথী’ পর্যায়ের জনশক্তি ছিলেন। আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে বুরহান উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক সংগঠন ময়মনসিংহ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রক্তদান–বিষয়ক সংগঠনের সহসভাপতি ছিলেন।
প্যানেলে তিন নারী প্রার্থীর মধ্যে ছাত্রী সংস্থার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভানেত্রী আমিনা বেগম ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক পদে, সংগঠনটির সেক্রেটারি সুমাইয়া নাভা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের মেয়ে আদিবা সালেহা সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আলোচনা আছে, ছাত্রী হলগুলোয় ছাত্রী সংস্থার একটি ভালোসংখ্যক জনশক্তি আছে। এমনকি ছাত্রী হল সংসদের ২৭টি পদের মধ্যে ২১টিতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী নেই। ছাত্রশিবির প্যানেলের অন্যান্য পদে শাখা ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
চ্যালেঞ্জ শুধু ‘ভোটের সমীকরণে’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। তবে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ আছে। বিগত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির ‘নির্ভার’ থাকলেও এর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে কি না, তা নিয়েও চলছে হিসাব–নিকাশ। নির্বাচনের জনশক্তিদের ভোটে শিবিরের প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনে ‘সুইং’ ভোটারদের কেমন সাড়া মিলবে, তা আলোচনায় আছে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু বা অন্যান্য ক্যাম্পাসে মতো শিবির প্যানেলে ভিন্নধর্মের বা মতাবলম্বীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ভোটের মাঠে এটাও একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসানের সাক্ষাৎকার
প্রথম আলো: আপনাদের প্যানেলকে ‘ইনক্লুসিভ’ বলছেন কেন? বৈচিত্র্য কী আছে?
দেলোয়ার হাসান: আমরা ‘ইনক্লুসিভ’ বলছি; কারণ, আমাদের প্যানেল কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ, অঞ্চল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আছে বিভিন্ন বিভাগ, ব্যাচ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা। আমরা বিশ্বাস করি, সাস্টের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কণ্ঠই গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এখানে আমরা ব্যক্তির বিষয়ভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং পূর্ববর্তী সময়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁদের অবদান মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি।
প্রথম আলো: নারী শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে পরিকল্পনা কী?
দেলোয়ার হাসান: নিরাপদ ক্যাম্পাস, হয়রানি প্রতিরোধ, আবাসন, একাডেমিক, গবেষণা ও ক্যারিয়ার সাপোর্ট—এই বিষয়গুলো আমাদের অগ্রাধিকার, আর এসব নিয়েই আমরা নারী শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি।
প্রথম আলো: শিক্ষার্থীরা আপনাদের কেন ভোট দেবেন?
দেলোয়ার হাসান: কারণ, আমি মনে করি, আমরা কথা নয়, কাজের মাধ্যমে অঙ্গীকার রক্ষায় বিশ্বাস করি। শিক্ষার্থীদের অধিকার, একাডেমিক পরিবেশ, হল সমস্যা, পরিবহন ও ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা—এসব বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান নিয়ে আমরা মাঠে আছি। আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, জবাবদিহি দিতে চাই।
প্রথম আলো: অনেকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে শিবিরের প্রভাব রয়েছে—এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?
দেলোয়ার হাসান: আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রভাব নয়, সাস্ট চলবে নিয়ম, ন্যায় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে। এটাই আমাদের অবস্থান।
প্রথম আলো: জয়ের ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী?
দেলোয়ার হাসান: আমরা আলহামদুলিল্লাহ আত্মবিশ্বাসী। কারণ, শিক্ষার্থীদের দারুণ সাড়া ও দোয়া পাচ্ছি। এ আত্মবিশ্বাস অহংকার থেকে নয়, বরং আসছে শিক্ষার্থীদের আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস থেকে। অবশ্যই শেষ পর্যন্ত রায় দেবে শিক্ষার্থীরাই, আর আমরা সেই রায়ের জন্য প্রস্তুত আছি।