টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে ৪ মাসে ৫ মৃত্যু, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। কিন্তু নিরাপত্তার নিয়ম মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যায়। সম্প্রতি হাওরের জয়পুর এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে কেউ বেড়াতে যান পরিবারের সঙ্গে আনন্দের একটি দিন কাটাতে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখতে। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা কারও কারও জীবনের শেষযাত্রায় পরিণত হচ্ছে। কখনো চলন্ত নৌযান থেকে পড়ে, কখনো গোসল করতে নেমে, আবার কখনো নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন পর্যটকেরা।

গত চার মাসে এমন পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আগস্টের ২০ দিনে মারা গেছেন তিনজন। মৃত্যুর তালিকায় শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার হাওরের পানিতে ডুবে রাজশাহী থেকে বেড়াতে আসা এক শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাওরে পর্যটকের ভিড় বাড়লেও নিরাপত্তার নিয়ম মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা বলছে প্রশাসন। ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত ‘টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি’র সভায় জেলা প্রশাসনের জারি করা ১৩ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে দুই দিনের মধ্যে হাওরে পর্যটকদের বহনকারী সব হাউসবোট ও নৌযানকে নিবন্ধনের আবেদন করতে বলা হয়েছে। না হলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন সব সময়ই পর্যটক আসেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পর্যটক আসেন বেশি। তাঁরা দিনভর হাউসবোট, নৌকায় করে হাওরে ঘুরে বেড়ান। অনেকে হাওরে হাউসবোট ও নৌকায় রাতযাপন করেন। পর্যটকদের বহনে হাওরে দুই শতাধিক বিলাসবহুল হাউসবোটের পাশাপাশি চার শর মতো নৌকা আছে।

সুনামগঞ্জের এখন দুই শতাধিক হাউসবোট আছে। যেগুলো পর্যটকদের নিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপর ও মধ্যনগর উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান। ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে ছোট–বড় ১০৯টি বিল আছে আর জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল ও নালা। বর্ষায় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই হাওর এখন পর্যটকদের কাছে অতিপ্রিয় স্থান। সরকার গত বছরের ৬ নভেম্বর ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ’ জারি করেছে।

অসচেতনতায় চার মাসে পাঁচ মৃত্যু

রাজশাহী নগরের নওদাপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষার্থী আবদুল মাজেদ (২৪) ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসেন। সকালে তাহিরপুর ঘাট থকে হাউসবোটে করে হাওরে রওনা দেন তাঁরা। পথে লামাগাঁও এলাকায় বোট স্থানীয় একটি বাজারের ঘাটে থামে। তখন কয়েকজন কিছু কেনাকাটা করার জন্য নামেন। এই ফাঁকে গোসল করার উদ্দেশ্যে বোট থেকে পানিতে ঝাঁপ দেন মাজেদ। কিন্তু তিনি আর ভেসে ওঠেননি। এরপর স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজি করে তাঁর লাশ উদ্ধার করেন।

আরও পড়ুন

এর আগে ২১ আগস্ট ফরিদপুর থেকে পরিবারের সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসেছিল শিশু রোকাইয়া নূর (১০)। হাউসবোটের ছাদে অন্যদের সঙ্গে ছিল সে। একফাঁকে চলন্ত হাউসবোট থেকে পানিতে পড়ে যায় রোকাইয়া। একদিন পর পানিতে ভেসে ওঠে তার লাশ। ৭ আগস্ট হাওরের গোলাবাড়ি এলাকায় হাউসবোট থেকে পানিতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান সিরাজগঞ্জ থেকে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে আসা আলী আকবর খান (৭২)।

এরও আগে ৬ জুন পরিবারের সঙ্গে হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে মারা যায় জেলার ধর্মপাশা উপজেলার কামলাবাজ গ্রামের মৌমাতা সরকার (৮)। ৩০ মে বেড়াতে এসে নৌকার ছাদে উচ্চ স্বরে বাজানো গানের সঙ্গে দলবেঁধে নাচতে নাচতে হঠাৎ পানিতে পড়ে তলিয়ে যায় একই উপজেলার বাসিন্দা তামিম ইসলাম (১৭)। পরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ১৫ আগস্ট মা-বাবার সঙ্গে সিলেট থেকে হাওরে বেড়াতে আসা মাসুম আহমদ (৫) নামের এক শিশু নৌকার জানালা দিয়ে পানিতে পড়ে যায়।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে লামাগাঁও এলাকার এই স্থানে পানিতে ডুবে বৃহস্পতিবার সকালে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়
ছবি: প্রথম আলো

নির্দেশনা আছে, মানতে অনীহা

সরকারের পক্ষ থেকে টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ জারির পর ৩ আগস্ট টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও পর্যটনে শৃঙ্খলা নিশ্চিতে ১৩ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করে জেলা প্রশাসন। এতে হাওরের সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটকবাহী হাউসবোট ও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, এসব নৌযানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়।

এখন প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করছে। নিবন্ধন ছাড়া হাওরে কোনো নৌযান পর্যটকদের বহন করতে পারবে না।
মো. মতিউর রহমান খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাউসবোট ও নৌকাগুলোর প্রতি প্রশাসনের যেসব নির্দেশনা আছে, তাদের অনেকেই সেগুলো মানে না। হাওরে পর্যটকদের লাইফ জ্যাকেট পরার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু গত চার মাসে মারা যাওয়া রোকাইয়া, আলী আকবর খান, তামিম ইসলাম কিংবা আবদুল মাজেদ কারও গায়েই লাইফ জ্যাকেট ছিল না।

এ ছাড়া উচ্চ স্বরে গানবাজনা করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নৌযানে প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রিং না রাখা, এসব ব্যবহারে পর্যটকদের উৎসাহিত না করার অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। এগুলো মানলে দুর্ঘটনা কম হবে। হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে। কিন্তু হাওরে তো কোনো শৃঙ্খলা নেই। যে যার মতো চলছে। যে কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বাড়ছে।

নৌযান চার শতাধিক, আবেদন মাত্র ৪৯টির

টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির সভায় বৃহস্পতিবার জানানো হয়, এ পর্যন্ত মাত্র ৪৯টি হাউসবোট ও নৌকার পক্ষ থেকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি আলোচনার পর হাউসবোট অ্যাসোসিয়েশন ও তাহিরপুর নৌকা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আবেদনের জন্য আর দুই দিন সময় চাওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান সভাপতিত্ব করেন।

হাওর–কেন্দ্রিক পর্যটনে শৃঙ্খলা আনতে চলতি মাসে ১৩ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন
ছবি: প্রথম আলো

হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আরাফাত হোসাইন ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, হাওরে এখন দুই থেকে আড়াই শ হাউসবোট আছে। পর্যটকদের নিয়ে হাওরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাউসবোট ও নৌকা প্রবেশ করে। বিশেষ করে মধ্যনগর হয়ে যেগুলো হাওরে ঢোকে, সেগুলোতে সমস্যা হচ্ছে বেশি। অনেক বোটে নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না। তবে অনেক হাউসবোট সব নিয়ম মেনে চলছে দাবি করে আরাফাত হোসাইন বলেন, ‘আমরা নিয়মের মধ্যেই হাওরে হাউসবোট চালাতে চাই। কিন্তু এখন তো চারদিক থেকে নৌকা, হাউসবোট আসছে। এটাতে সমস্যা হচ্ছে। দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, এ জন্য সবার সচেতনতা প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন

জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, এখন প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করছে। নিবন্ধন ছাড়া হাওরে কোনো নৌযান পর্যটকদের বহন করতে পারবে না। দুই দিন সময়ে দেওয়া হয়েছে। পরে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সামাজিক সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখন প্রথম কাজ হচ্ছে সব নৌযানকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা। একই সঙ্গে প্রশাসন থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মানতে বাধ্য করা। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, হাউসবোট ও নৌকার মালিক-শ্রমিক এবং পর্যটক সবার আন্তরিকতা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন