সাড়ে ১৩ ঘণ্টায় শেষ হলো গণনা, টাকার অঙ্কে রেকর্ড ভেঙেছে পাগলা মসজিদ

এবার কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩ সিন্দুকে মিলেছে রেকর্ড ৪৩ বস্তা টাকা। গননা শেষে জানা গেছে, টাকার পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটিছবি: প্রথম আলো

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ৪৩ বস্তা টাকা প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টা পর গণনা শেষ হয়েছে। এবার পাওয়া গেছে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া মিলেছে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল স্বর্ণালংকার।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের নেতৃত্বে আজ শনিবার সকাল সাতটার দিকে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক এরশাদুল আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আজ সকাল ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গণনা শেষে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া গেছে। গতবারের তুলনায় এবার একটু বেশি সময়—ছয় মাস পর সিন্দুক খোলা হয়েছে। টাকার অঙ্কও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

টাকা গণনার সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পাগলা মস‌জিদ কমিটির সদস‌্যস‌চিব মো. কামরুল হাসানসহ অনেকে।

টাকা গণনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া ও পাগলা মসজিদের এতিমখানাসহ দুটি মাদ্রাসার প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী; রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন স্টাফ; মসজিদ কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ পাঁচ শতাধিক লোক।

আরও পড়ুন

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, সকাল থেকে টাকার সিন্দুক খোলা, বস্তায় ভরে এনে গণনা শেষে ব্যাংক পর্যন্ত সব টাকা নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সার্বিক নিরাপত্তার কাজে তিনিসহ তাঁর পুলিশ সদস্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন। গণনার দিন ছাড়াও বাকি দিনগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন সিন্দুকের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন।

কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটি গড়ে ওঠে। কথিত আছে, খাস নিয়তে এ মসজিদে দান করলে মানুষের মনের আশা পূরণ হয়। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে এসে দান করে থাকেন।

টাকা গননার সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ
ছবি: প্রথম আলো

প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে পাগলা মসজিদে দান করতে আসেন। চার থেকে ছয় মাস পরপর সিন্দুকগুলো খোলা হয়। প্রতিবারই পাওয়া যায় বিপুল টাকাপয়সা, বৈদেশিক মুদ্রাসহ স্বর্ণালংকার। এ ছাড়া মসজিদে নিয়মিত হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন ধরনের গবাদিপশু ও জিনিসপত্র দান করে মানুষ।

এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ৩ মাস ২৭ দিন পর মসজিদের দানবাক্সগুলো থেকে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। টাকা ছাড়াও পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রা, সোনার গয়না ও হীরা।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানান, পাগলা মসজিদ ও ইসলামি কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। আগে প্রায় ১১৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যাংকে জমাসহ অনলাইনে দানের আরও প্রায় ২৫ লাখ টাকা জমা ছিল। আজকের টাকা গণনা শেষে আগের টাকার সঙ্গে ব্যাংকে জমা হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদের দান করা বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল স্বর্ণালংকার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে গচ্ছিত আছে। এগুলোও সময়–সুযোগে প্রকাশ্যে নিলামে তুলে বিক্রি করা হবে। পরে মূল টাকার সঙ্গে ব্যাংকে জমা রাখা হবে।

পাগলা মসজিদের টাকায় একটি আধুনিক মসজিদ ও ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদে জমা করা লভ্যাংশের টাকা জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সহায়তাও করা হয়ে থাকে। মসজিদের কলেবর বাড়াতে আগের ৫ দশমিক ৫ একর জায়গার পাশাপাশি আরও ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ জায়গা কেনা হয়েছে।

মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান আধুনিক তুরস্কের বসফরাস প্রণালির পাশে যে দৃষ্টিনন্দন, মাল্টিপারপাস মসজিদ আছে, এগুলোর আদলে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদকেন্দ্রিক একটি ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। ১০ তলাবিশিষ্ট একটি ভবন হবে। এখানে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়সহ আলাদাভাবে পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির নামাজের সুব্যবস্থা থাকার পাশাপাশি বহুমুখী কাজ করা হবে।

এ ছাড়া এতে অনাথ–এতিমদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা, ধর্মীয় শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, একটা সমৃদ্ধ পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া ও আইটি সেকশনও থাকবে। জেলা প্রশাসনের আওতায় এ মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স হবে। ১০ তলাবিশিষ্ট আধুনিক মাল্টিপারপাস ভবনের জন্য আরও কিছু জায়গা কেনা হবে। জেলা প্রশাসন ও মসজিদ কমিটি অতিসত্বর ইসলামিক কমপ্লেক্সের কার্যাদেশ দেবেন এবং কাজ শুরু হয়ে যাবে।