রংপুর মেডিকেলে লোডশেডিংয়ের সময় চিকিৎসা চলে মুঠোফোনের আলোয়
বিদ্যুৎ চলে গেলেই অন্ধকারে ডুবে যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২টি ওয়ার্ড। তখন মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে রোগী দেখতে হয় চিকিৎসকদের। একই আলোয় স্যালাইনের সুই ফোটান নার্সরা, ব্যবস্থাপত্র লেখেন চিকিৎসকরা। বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ থাকায় দুর্ভোগের শেষ থাকে না রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের ৪০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আট দিন ধরে মেডিসিন বিভাগের ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে লোডশেডিংয়ের সময় রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ চলে গেলে ৬, ৭, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভুতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়। এসব ওয়ার্ডে জেনারেটরের সংযোগ নেই।
কারেন নাই। আন্দারোত (অন্ধকারে) কিছুই দেখা যাওচে না। হামরা কাকে কই? হামার কথা কাঁয়ও শোনে না।বজলুল হক, এক রোগীর ছেলে
গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎবিভ্রাটের সময় হাসপাতালের ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য রোগী। দুটি ওয়ার্ডই অন্ধকারে ছেয়ে যায়। চিৎকার–চেঁচামেচি করছিলেন রোগীরা। চিকিৎসকেরা মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে রোগী দেখছিলেন, ব্যবস্থাপত্র লিখছিলেন। নার্সরা মুঠোফোনের আলোয় রোগীর হাতে স্যালাইনের সুচ ফোঁড়েন। রোগীরা কেউ কেউ মুঠোফোনের আলোয় রাতের খাবার ও ওষুধ খাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম থেকে ছোট বোনকে চিকিৎসা করাতে হাসপাতালে এসেছেন মহসিন মিয়া। তিনি বলছিলেন, ‘এক ঘণ্টা থেকে কারেন্ট নাই। ফ্যান চলে না, খুব গরম। রোগী গরমে আরও অসুস্থ হচ্ছে।’ লালমনিরহাট থেকে মায়ের চিকিৎসার জন্য আসা মোহাম্মদ বজলুল হক বলেন, ‘কারেন নাই। আন্দারোত (অন্ধকারে) কিছুই দেখা যাওচে না। হামরা কাকে কই? হামার কথা কাঁয়ও শোনে না।’
ওয়ার্ডগুলোর একাধিক চিকিৎসক, নার্স এবং অন্তত পাঁচজন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত আট দিন ধরে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ–ছয়বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার কম করে হলেও আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
কর্তব্যরত চিকিৎসক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, আট দিন ধরে ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের জরুরি সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। মুঠোফোনের আলোয় রোগীদের দেখতে হচ্ছে। এখন ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে। একে তো গরম, তার ওপর রোগীর চাপ বেশি। এতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।
আগে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের মাধ্যমে হাসপাতালের সব ওয়ার্ডে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো বলে জানালেন হাসপাতালের বিদ্যুৎমিস্ত্রি কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, নেসকো (উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান) হাসপাতালে ডুয়েল ফিডার চালু করায় ১২টি ওয়ার্ডে জেনারেটরের জরুরি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ গেলে ওয়ার্ডগুলোতে ভুতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। কিছু ওয়ার্ডে জেনারেটরের জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল মোকাদ্দেম বলেন, হাসপাতালে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। কিছু ওয়ার্ডে জেনারেটরের জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেন গণপূর্ত বিভাগের ইলেকট্রোমেকানিকস উপবিভাগের প্রকৌশলী মিজানুর রহমান আকন্দ। তিনি জানালেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুরোনো হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা রয়েছে। হাসপাতালে ছয়টি উপকেন্দ্র আছে। সেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজন ৮ মেগাওয়াট হলেও সক্ষমতা আছে ৫ মেগাওয়াটের। জরুরি কাজের জন্য অস্ত্রোপচার কক্ষ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও কেবিন ওয়ার্ডে জেনারেটর সংযোগ দেওয়া আছে; বাকি ওয়ার্ডগুলোতে নেই।
মিজানুর রহমান আকন্দ বলেন, ‘দুই দিন ঘুরে দেখেছি, একটু অগোছালো আছে। আমরা বসে সিদ্ধান্ত নেব, আর কী কী করা যায়। সেসবের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব।’