কালের সাক্ষী কুড়িগ্রামের ঐতিহাসিক চান্দামারী মসজিদ
গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে তিন গম্বুজওয়ালা প্রাচীন একটি স্থাপনা। সময়ের ক্ষয়, বাতাসের ধুলা আর ঋতুর পালাবদল পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইট-চুন-সুরকির স্থাপনাটিই কুড়িগ্রামের ঐতিহাসিক চান্দামারী জামে মসজিদ। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, মোগল আমলে নির্মিত এ মসজিদের বয়স প্রায় সাড়ে চার শ বছর। নিয়মিত নামাজ আদায় করেন স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা।
মসজিদটির অবস্থান কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চান্দামারী মণ্ডলপাড়া গ্রামে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৫১ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠেছে মসজিদটি। দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ ফুট, প্রস্থ ২২ ফুট। স্থাপত্যের সৌন্দর্যে আলাদা করে সবার নজর কাড়ে। চার পাশে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া। উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। তিনটি করে গম্বুজ ও মিহরাববিশিষ্ট এ মসজিদ নির্মিত হয়েছে ইট, চুন ও সুরকির মিশ্রণে।
মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট শিলালিপি নেই। স্থানীয় লোকজনের মুখে প্রচলিত আছে, এটি মোগল আমলে নির্মিত। রাজারহাট আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক জাকির হোসেনের সংগ্রহে থাকা ‘ইতিহাস: বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, আনুমানিক ১৫৮৪ থেকে ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মসজিদটি নির্মিত। স্থাপত্যে সুলতানি আমলের শিল্পবৈশিষ্ট্য ও মোগল ধাঁচের সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ ভারতের বাবরি মসজিদ ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের সঙ্গে এর স্থাপত্যের সাদৃশ্যের কথা বলেন। যদিও গম্বুজের সংখ্যা কম। তবু কারুকাজ ও গাঁথুনির দৃঢ়তায় চান্দামারী মসজিদ স্বাতন্ত্র্য ভাব ধরে রেখেছে।
মসজিদের বারান্দায় বসে কথা হয় ৮০ বছর বয়সী মেহের আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় দাদার হাত ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়তে আসতাম। দাদা বলতেন, এই মসজিদের অনেক অলৌকিক কাহিনি আছে। আমরা ইতিহাস জানি না। কিন্তু শুনে এসেছি, এটি বহু পুরোনো। এই মসজিদের ইতিহাস দাদা শুনেছেন তাঁর দাদার কাছে।’
মসজিদটি ঘিরে মানুষের মনে একধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়। শুধু নামাজ আদায় নয়, অনেকে কৌতূহলবশতও মসজিদটি দেখতে আসেন। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মসজিদটি কিছুটা জৌলুশ হারালেও মূল কাঠামো এখনো অটুট। সংরক্ষণের বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও সংরক্ষণকাজ শুরু হলে এটি উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যস্থানে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় সামাজিক ও গবেষণাধর্মী সংগঠন ‘ইতিহাস গবেষণা চক্রের’ সদস্য খন্দকার আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদের গায়ে কোথাও নির্মাণসাল না থাকলেও স্থাপত্যশৈলী দেখে মসজিদটি যে মোগল আমলের একটি স্থাপনা, তা সহজেই অনুমান করা যায়। মসজিদটি না ভেঙে সংরক্ষণ করা গেলে এটি জেলার প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হবে।