চট্টগ্রাম নগরের তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসী’ ও কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নগর ভবনে বাধার মুখে পড়েছিল পুলিশ। এ ঘটনায় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন। মেয়রের দাবি, ‘ওয়াকিল সন্ত্রাসী নয়, জুলাই যোদ্ধা।’ তাঁকে দলের ত্যাগী নেতা বলে দাবি করেন তিনি।
মেয়রের এসব বক্তব্যের পরদিন গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে নগর বিশেষ শাখায় (সিটি এসবি) ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশ কমিশনার অবশ্য এটিকে রুটিন বদলি বলেছেন। তবে মাত্র এক মাস ১০ দিন আগে খুলশী থানায় যোগ দেওয়া ওসিকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওয়াকিল নগর ভবনে অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে খুলশী থানার পুলিশ টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে যায়। পুলিশ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে মেয়র ও অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেও ওয়াকিলকে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ফিরে যায়।
ওয়াকিল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। মেয়রের অনুসারী হিসেবে তিনি পরিচিত। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিন মাস আগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
অভিযানের পর মেয়রের বক্তব্য
পরদিন নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি খুলশী থানার ওসিকে সরানোর দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, আবদুর রহিম পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
মেয়র বলেন, ‘পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত ওয়াকিলকে তিনি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হিসেবে মানেন না। তাঁর দাবি, ওয়াকিল গত ১৭-১৮ বছর বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অংশ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ১৭০ থেকে ১৮০টি মামলা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন মেয়র।
ওসি আবদুর রহিমের বিষয়ে মেয়র বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বাকলিয়া থানার ওসি ছিলেন। তখন তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বাকলিয়ায় আয়োজিত একটি মেজবান থেকে খাবারের ডেকসি (পাতিল) পর্যন্ত নিয়ে যান তিনি।
খুলশী থানায় যোগ দেওয়ার পরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, অথচ ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ হৃদয় হত্যার মামলাকে কেন্দ্র করেও ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মেয়র। তাঁর দাবি, মামলার আসামি কামরুলকে মারধর করে ওয়াকিল ও তাঁর ভাইয়ের নাম বলানো হয়েছে। ওয়াকিলের দুই ভাই এ অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওয়াকিলকে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন, এমন প্রচারের প্রতিবাদ করে মেয়র বলেন, ওয়াকিল তাঁর কাছে আসেননি; তাঁর দুই ভাই অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। কেউ মামলার আসামি বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব।
মেয়রের গাড়িতে করে ওয়াকিল নগর ভবন থেকে বের হয়েছেন, এমন প্রচারও নাকচ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ওয়াকিল তাঁর গাড়িতে উঠেছেন, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর ‘ভালো ইমেজ নষ্ট’ করতে এসব করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন মেয়র।
ওয়াকিলের পক্ষে ও ওসিকে সরানোর দাবি প্রসঙ্গে মেয়র শাহাদাত হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি না ধরায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তাঁকে খুদেবার্তা দেওয়া হলেও তিনি উত্তর দেননি।
ওসির বক্তব্য
মেয়রের অভিযোগের বিষয়ে আবদুর রহিম বলেন, তিনি ছুটিতে ছিলেন। নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের বিষয়ে তিনি জানেন না। খুলশী থানার ওসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর এক কলেজশিক্ষককে মারধরের মামলায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই সময় ওয়াকিলের লোকজন পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর করে বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুর রহিম বলেন, পরে কিশোর হৃদয় হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
বাকলিয়ায় ওসি থাকাকালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীর জিয়াফতের জন্য রান্না করা খাবারের ডেকসি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তাঁর দায়িত্বকালে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
চাপে পড়ে বদলি হয়েছেন কি না—জানতে চাইলে আবদুর রহিম বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। কর্তৃপক্ষ যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেবেন, সেখানে করব।’
নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের পরদিনই ওসিকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওসির বদলি আমাদের রুটিনমাফিক হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’
তবে পুলিশের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের কয়েকজন বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করলেই একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ওয়াকিলের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা
ওয়াকিলের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৩টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এসব অপরাধ করে বেড়াতেন বলে জানায় পুলিশ।
গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে খুলশী থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় ওয়াকিলকে আসামি করা হয়। মামলা নেওয়ার কারণে ওসি আবদুর রহিমকে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে ‘লেংটা করে পেটানোর’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ওসি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ।
তবে পুলিশের ওই অভিযানের ঘটনায় পরে ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধেও আদালতে মামলা করেন ওয়াকিলের বাবা। এতে অভিযোগ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করে। এতে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষ—সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টারের বিরোধে হৃদয় নিহত হন। ওই ঘটনায় করা মামলায়ও ওয়াকিলকে আসামি করা হয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ওয়াকিলের গ্রুপ সেভেন স্টার এবং খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের গ্রুপ ফাইভ স্টারের বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে ওয়াকিলসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে খুলশী থানায় আরেকটি মামলা হয়। এতে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম খবর-এর সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মুহাম্মদ আরিফ মামলাটি করেন। তিনি যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আফলাতুনের ছেলে।
মামলার এজাহারে বাদী পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ১১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ এপ্রিল তাঁকে অপহরণ করে ওয়াকিলের আস্তানায় নিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।
ওয়াকিলের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর ভাই নগর ছাত্রদলের সদস্য রকি হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে একটি পক্ষ তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
মামলার বাদী শেখ মুহাম্মদ আরিফ গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন কিশোর গ্যাং নেতার জন্য মেয়রের এত দরদ কেন।’ তাঁর দাবি, ওয়াকিলের ভয়ে খুলশী ও আকবর শাহ এলাকার মানুষ আতঙ্কে আছেন।
কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিলকে ধরতে গিয়ে মেয়রের অসহযোগিতাকে দুঃখজনক উল্লেখ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীর পরিচয় সন্ত্রাসী। তাঁকে ধরতে পুলিশকে সহযোগিতা করা জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়রের দায়িত্ব ছিল। ওসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি পুলিশ কমিশনারকে অবগত করতে পারতেন। দোষী হলে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। একজন সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং নেতার পক্ষে সাফাইয়ের পর ওসিকে বদলিতে পুলিশের কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত হবে।