এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ঘরটিতে ককটেল তৈরি হচ্ছিল: পুলিশ
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় ককটেল বিস্ফোরণে এক ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনার পর স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে আধিপত্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। পুলিশের ভাষ্য, এলাকার আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ওই ঘরের ভেতর ককটেল তৈরি করা হচ্ছিল। আর সেই ককটেল বানানোর সময় আজ বৃহস্পতিবার ভোরে ঘটে বিস্ফোরণের ঘটনাটি।
বিস্ফোরণের ঘটনায় সোহান ব্যাপারী (৩২) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন আরও দুজন। সোহান ব্যাপারীর বাড়ি চেরাগআলী ব্যাপারীকান্দি গ্রামে। আহত দুই ব্যক্তি ঢাকায় চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে নবীন সরদারের (২৫) অবস্থা আশঙ্কাজনক। নবীনের বাড়িও একই গ্রামে। আহত অন্য ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
আজ দুপুরে ঘটনাস্থলে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারভীর হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘরটিতে যা পাওয়া গেছে, তাতে মনে হচ্ছে, সেখানে বসে ককটেল বানানো হচ্ছিল। সড়কে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এলাকার দুটি বিবাদমান পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জন্যই এসব ককটেল তৈরি করা হচ্ছিল। সামনে নির্বাচন থাকলেও প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এগুলো নির্বাচনী সহিংসতার উদ্দেশ্যে বানানো হচ্ছিল না। এরপরও ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল জোরদার করা হয়েছে।
বিলাশপুরে দীর্ঘদিনের বিরোধ
স্থানীয় গ্রামবাসী ও জাজিরা থানা সূত্রে জানা যায়, বিলাশপুর ইউনিয়নের রাজনীতি ও স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইউপি চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল জলিল মাদবরের মধ্যে বিরোধ চলছে। কুদ্দুস উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং জলিল উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য।
একাধিক গ্রামবাসী জানান, চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী তাঁর চাচাতো ভাই সাগর ব্যাপারীকে মুলাই ব্যাপারীকান্দি গ্রামের একটি নির্জন স্থানে নতুন বসতঘর নির্মাণ করে দেন। সেখানে কেউ বসবাস করতেন না। আজ ভোরে ওই ঘরের ভেতরে বিস্ফোরণ হলে টিনের চালা, কাঠ ও বেড়া উড়ে যায়। আহত তিনজনকে নিয়ে সহযোগীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে পাশের সাতঘরিয়াকান্দি গ্রামের একটি ফসলি জমিতে সোহানের লাশ ফেলে রাখা হয়।
গত বছরের ৫ এপ্রিল ও ২ নভেম্বর কুদ্দুস ও জলিলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই মামলায় আবদুল জলিল মাদবর বর্তমানে কারাগারে। আর চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকা ছেড়েছেন।
বর্তমানে কুদ্দুসের সমর্থক মান্নান ব্যাপারী এবং জলিলের সমর্থক ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিন ব্যাপারীর লোকজন নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার রাত ও রোববার সকালে বুধাইরহাট এলাকায় মান্নান ও নাসির উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তখন শতাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এর জেরে দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দুটি বসতবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। ওই সময় জাবেদ শেখ নামের এক তরুণের হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় জাজিরা থানায় দুটি মামলা হয়েছে।
সরেজমিন ঘটনাস্থল
আজ সকালে ককটেল বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ঘরটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম, ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ও হতাহত ব্যক্তিদের ব্যবহৃত জুতা। ঘরের চালার টিন পাশের গাছ ও বাঁশের সঙ্গে ঝুলে আছে। হতাহতদের সরিয়ে নেওয়ার সময় উঠোন ও সড়কে লেগে থাকা রক্তের দাগ ঢাকা হয়েছে বালু দিয়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘরটির মালিক সাগর ব্যাপারীর স্ত্রী শিল্পী আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ঘরটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। তাই সেখানে বসবাস করা হয় না। সেখানে কীভাবে কি হয়েছে, তা তিনি বলতে পারবেন না। তাঁর স্বামী (সাগর) ভ্যান-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। গতকাল রাত ৩টার দিকে তিনি ভ্যান নিয়ে বের হয়ে যান। এর পর থেকে তাঁকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বিস্ফোরণের ঘটনায় আহতদের একজন নবীন সরদার। ছেলের কোনো খবর না পেয়ে বাড়ির উঠানে বসে কাঁদছিলেন তাঁর মা রুমিনা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের রমজান মাসে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরেন নবীন। এরপর তাঁকে বুধাইরহাটে একটি দোকান খুলে দেওয়া হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়েই নবীন দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েন। সর্বশেষ তাঁর সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় দেখা হয়েছিল। এর পর থেকে তাঁর কোনো খবর পাচ্ছেন না।
ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সোহানের বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁর (সোহান) স্ত্রী পিংকি আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামীর (সোহান) বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দিয়েছেন নাসির উদ্দিন। নাসির ও তাঁর লোকজন ককটেল বিস্ফোরণে আমার স্বামীকে মেরেছে। আমি এখন দুই শিশুসন্তান নিয়ে কোথায় যাব? কে আমার পরিবারের দায়িত্ব নেবে?’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুদ্দুস ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন ও মান্নান ব্যাপারীর বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। তবে তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। সবার বাড়িতে তালা লাগানো ছিল। তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিস্ফোরণের পর পর মুলাই ব্যাপারীকান্দি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামটির পাশের বুধারহাট বাজারের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সহ চেরাগআলী ব্যাপারীকান্দির অধিকাংশ বাড়িতেই কোনো পুরুষ সদস্য নেই।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহম্মদ বলেন, ‘আমরা ঘটনাটির তদন্ত করছি। আর ওই সময় যাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিহত ব্যক্তির মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। আর আহত দুজনকে ঢাকায় কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’