চট্টগ্রামে বাসায় বিস্ফোরণের কারণ ১ মাসেও অজানা
৬ জনের মৃত্যু, ৩ জন হাসপাতালে। ভবনটির অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেঙে যায়। গ্যাস বিস্ফোরণ নয় বলছে কেজিডিসিএল।
ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের হালিশহরের একটি ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনার কারণ খুঁজে পায়নি ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস লিকেজ থেকে ওই বিস্ফোরণ হয়নি। সেখানে বিস্ফোরণের সম্ভাব্য কারণ বলা হলেও প্রকৃত কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ওই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে মোটর পার্টস ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেন পরিবার নিয়ে থাকতেন। বিস্ফোরণে ওই বাসার ৯ জন দগ্ধ হন, যার মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিচ্ছে তিন শিশু।
বিস্ফোরণের সময় ভবনটির অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেঙে যায়। ফলে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফায়ার সার্ভিস ধারণা করেছিল, বাসাটির গ্যাসের লাইন থেকে নির্গত হওয়া গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গ্যাস লিকেজ থেকে এ ঘটনা ঘটেনি বলেছে কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটি। স্বজনদেরও ভাষ্য, গ্যাস থেকে এ বিস্ফোরণ হয়নি।
এ ঘটনায় কেজিডিসিএল ছাড়া পৃথক তদন্ত কমটি গঠন করেছিল ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন। দুটি কমিটিকেই সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তবে দুটি কমিটিই এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কেজিডিসিএল প্রতিবেদন দিয়েছে ঘটনার তিন সপ্তাহের মাথায়। মূলত ওই প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বাকি দুই কমিটি কাজ করবে।
কেজিডিসিএলের প্রতিবেদনে যা আছে
কেজিডিসিএলের বিতরণ উত্তর বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রফিক খানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ১২ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে রান্নাঘরের চুলা, চুলার পেছনের গ্যাসলাইন, নবসহ আশপাশের বেশ কিছু জিনিসপত্র প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এমনকি রান্নাঘরে থাকা তেজপাতা, প্লাস্টিকের কাগজসহ কিছু দাহ্য বস্তুতেও বড় ধরনের ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেজিডিসিএলের একজন কর্মকর্তা জানান, চুলার পেছনের লাইনে সামান্য লিক পাওয়া গেছে। তবে রান্নাঘরে দুটি দরজা, একটি বড় জানালা এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন থাকায় সেখানে গ্যাস জমে থাকার সম্ভাবনা কম। বিস্ফোরণের সময় সৃষ্ট তীব্র কম্পনের কারণে গ্যাসলাইনে পরবর্তী সময়ে ক্ষতি হয়ে লিক তৈরি হতে পারে। বিস্ফোরণের প্রধান কারণ গ্যাস লিকেজ নয়।
তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বাসাটিতে গাড়ির যন্ত্রাংশের কিছু কমপ্রেসিং ইউনিট রাখা ছিল, যেগুলোতে উচ্চ চাপে গ্যাস সংরক্ষিত থাকে। এ ছাড়া গাড়িতে রং করার কাজে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থও সেখানে মজুত ছিল। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রাসায়নিক পদার্থ কিংবা যন্ত্রাংশ—এসবের যেকোনো একটি থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, ভবনটিতে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল না। ঘটনাস্থলে মালিকপক্ষের কোনো প্রতিনিধিকেও পাওয়া যায়নি। ভবনের অনুমোদন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিতে মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই ভবন মালিকপক্ষের লোকজন কোনো ধরনের সহযোগিতা করছেন না। ঘটনার পরদিনই সব দরজা ঠিক করে ওই ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে আলামত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাট। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির কেউ এলে তালা খুলে দিতে হয়, সে কারণে চাবি আমাদের কাছে। আলামত সরালে তো সিসিটিভিতে দেখা যাবে।’
বিশ্লেষকেরা কী বলছেন
অগ্নিনিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল দ্রুত সুরক্ষিত (সিল) না করলে বা আলামত নষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকলে প্রকৃত কারণ বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। শুরুতেই ফ্ল্যাটটি অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষণ, বৈদ্যুতিক লাইন ও সার্কিট বোর্ডের ফরেনসিক পরীক্ষা, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের নমুনা সংগ্রহ করা দরকার ছিল। এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও তদন্ত প্রতিবেদন না আসা উদ্বেগজনক বলেও মনে করছেন তাঁরা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক (অপারেশনস) কামাল উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় বিস্ফোরণের উৎস নির্ধারণে শুধু গ্যাসলাইন নয়, বৈদ্যুতিক সংযোগব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য রাসায়নিক মজুতের বিষয়টি সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।