সংঘর্ষের সময় এক বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়ে মাথায় পুলিশের ছররা গুলি লাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরুখ মাহমুদের
ছবি: প্রথম আলো

মাথায় পুলিশের ছররা গুলির ‘পিলেট’ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরুখ মাহমুদ অস্ত্রপচার না করেই ফিরে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তার কারণে তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। পিলেটটা ভবিষ্যতে সমস্যা করতেও পারে, না–ও পারে। তবে সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গত শনিবার স্থানীয় বাসিন্দাদের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন শাহরুখ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

এদিকে সংঘর্ষের পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান। তাঁকে গত সোমবার আইসিইউ থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে তাঁর নাক থেকে অক্সিজেনের নল খুলে নেওয়ার পর থেকে তিনি কথা বলছেন। আজ বুধবার সকালে তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। রাকিবুল বলেন, ঘটনার দিন রাত ১০টার পরে বিনোদপুর গেটে পুলিশ খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে পিঠের বাঁ পাশে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো কিছু একটা ঘটে যায়, আর কিছু মনে নেই তাঁর। দুই দিন আইসিইউতে থাকার কথাও বলতে পারেন না। তিনি জানান, এক্স–রে দেখে বুঝতে পারছেন, এখনো তাঁর ২ হাতে প্রায় ৬০টি পিলেট রয়েছে। আর পিঠে ব্যথা রয়েছে।

শাহরুখ মাহমুদের বাড়ি রাজশাহী নগরের সপুরা এলাকায়। তাঁর সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছিলেন সহপাঠী সাধন মুখার্জী। মুঠোফোনে আজ সকালে যোগাযোগ করা হলে সাধন মুখার্জী বলেন, ঘটনার দিন রাত ১০টার পরে আহত এক বন্ধুকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল সেন্টারের কাছে নিয়ে আসার সময় শাহরুখের মাথায় গুলি লাগে। সেখান থেকে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিনই তাঁর একদফা অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু সিটি স্ক্যানে ধরা পড়া গুলির পিলেট তাঁর মাথা থেকে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়।

শতাধিক গুলির ‘পিলেট’ নিয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন এক শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ছবি: প্রথম আলো

সাধন মুখার্জী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে করে গতকাল বেলা ২টার দিকে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। জরুরি বিভাগ থেকে তাঁদের প্রথমে নিউরো মেডিসিন বিভাগে ও পরে নিউরো সার্জারি বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে সাজ্জাদ নামের একজন চিকিৎসক আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব কাগজপত্র দেখেন বলেন, পিলেটটা অনেক ভেতরে ঢুকে গেছে। আর মাথায় রক্ত চলাচল করছে। সিটি স্ক্যানে যে জায়গায় ওটা দেখা যাচ্ছে, অস্ত্রোপচার করলে ওই জায়গায় এখন না–ও পাওয়া যেতে পারে। এমন হতে পারে এক মিনিটেও পাওয়া যেতে পারে, আবার দীর্ঘ সময় অস্ত্রোপচার করা লাগতে পারে। বিষয়টি অনিশ্চিত।

এদিকে ১৯ মার্চ থেকে শাহরুখদের ‘ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা’। এসব বিষয় শুনে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বললেন, পিলেটটা ভবিষ্যতে সমস্যা করতেও পারে, না–ও পারে। তবে সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করতে হবে। এরপর আজ সকালে রাজশাহীর উদ্দেশে ট্রেনে উঠেছেন শাহরুখরা।

আরও পড়ুন

শতাধিক গুলির ‘পিলেট’ বুকে আইসিউইতে এক শিক্ষার্থী, চারজন ঢাকায়

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ আইসিইউতে আজও রয়েছেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান। তাঁর শরীরে শতাধিক গুলির ‘পিলেট’ পাওয়া গেছে। তাঁর পাচকতন্ত্রে ফুটো হয়েছিল। রাজশাহীতেই অস্ত্রোপচার করে সেটা ঠিক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মশিউরের সহপাঠী জনি আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, আইসিইউতে থাকলেও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

চোখে গুরুতর আঘাত পাওয়া মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আলিমুল ইসলাম। গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ছবি: প্রথম আলো

আহত অবস্থায় ঘটনার দিন রাতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। ওই দিন রাতেই তাঁদের চোখে অস্ত্রপ্রচার করা হয়। এঁদের তিনজনের ‘ভিট্রিয়ল রেটিনাল ইনজুরির’ কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। এই তিন শিক্ষার্থী হচ্ছেন মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আলিমুল ইসলাম, আইন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আল আমিন ইসলাম ও ফার্সি বিভাগের শেষ বর্ষের মিসবাহুল।

আরও পড়ুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ, আহত দুই শতাধিক

ঢাকা থেকে শিক্ষার্থী আল আমিনের বাবা আবদুস সেলিম আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, সকালে এই তিন শিক্ষার্থীর চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে হাসপাতালে বোর্ড বসানো হয়েছিল। তারপর কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে। এগুলো হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূর বলেন, তাঁরা সারাক্ষণ আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ রাখছেন। ছাত্রদের এই চিকিৎসা ব্যয়ের পুরোটাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করছে।

আরও পড়ুন

‘প্রশাসনের ব্যর্থতায় এত বড় সংঘর্ষ’