ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসক ও নার্স ছাড়াই চলছে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা

জেলায় ছয়টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন থাকলেও সম্প্রতি পেটানোর পর রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় একটি বন্ধ আছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পীরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত প্রত্যাশা মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় পরিচালিত পাঁচটি নিরাময় কেন্দ্রে অনুমোদিত শয্যার দুই থেকে তিন গুণ রোগী ভর্তি আছেন। চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা ওয়ার্ড বয় ছাড়াই চারদেয়ালে বন্দী পরিবেশে চলছে রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। এসব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত বিনোদন ও মানসিক বিকাশের ব্যবস্থাও নেই। ফলে কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসার পরিবেশ ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কেন্দ্রগুলোর পরিচালকদের দাবি, তাঁদের কেন্দ্রে চিকিৎসক আছেন। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় তাঁরা কাউকেই হাজির করতে পারেননি। যাঁদের চিকিৎসক হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তাঁদের সবাই খণ্ডকালীন। সপ্তাহে নির্দিষ্ট এক বা দুই দিন তাঁরা কেন্দ্রগুলোতে যান। নিয়ম অনুযায়ী, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পূর্ণকালীন চিকিৎসক থাকতে হয়।

জেলায় ছয়টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন থাকলেও সম্প্রতি পেটানোর পর রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় একটি বন্ধ আছে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ছয়টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মধ্যে ১০ শয্যার দুটি এবং ২০ শয্যার চারটি কেন্দ্র রয়েছে। ২০ শয্যার কেন্দ্রগুলো হলো প্রয়াস মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, আশীর্বাদ মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রত্যয় মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং অশ্রু মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। ১০ শয্যার কেন্দ্র দুটি হলো প্রত্যাশা মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং বার্তা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। 

১৮ আগস্ট রাতে প্রয়াস মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে সেখানে চিকিৎসাধীন রোগী মো. ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন দুপুরে এলাকার লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালালে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা ৪০ জন রোগী একসঙ্গে পালিয়ে যান। ২০ আগস্ট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এন এম কায়সার নিরাময় কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে অনিয়মের প্রমাণ পান। চিকিৎসক ছাড়াই কেন্দ্রটি চলছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে কেন্দ্রটি বন্ধ আছে।

জেলায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। তাই সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে মনোচিকিৎসক হিসেবে আমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি কেন্দ্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় দিই। ওষুধের পাশাপাশি রোগীদের উৎসাহ দিই।
মাহমুদুল হাসান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা

সরেজমিনে যা দেখা গেল

গত শনিবার এবং রোববার দুপুরে জেলার পাঁচটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, পাঁচটি কেন্দ্রই ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। অশ্রু মাদক নিরাময় কেন্দ্রে গুনে ৬১ জন, প্রত্যয়ে ৪৩ জন, বার্তায় ৪৫ জন ও প্রত্যাশায় ২৬ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর বাইরে প্রতিটি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা–পরবর্তী পর্যবেক্ষণের জন্য থাকা ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে দেখা যায়।

পাঁচটি কেন্দ্রের কোনোটিতেই চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয় পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ খেলাধুলার ব্যবস্থা, পত্রিকা ও ম্যাগাজিন, ক্লাসরুম, পৃথক আবাসন এবং খাওয়াদাওয়ার পৃথক ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। সব কটি নিরাময় কেন্দ্রে চারদেয়ালে বন্দী পরিবেশে চলছে রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

আরও পড়ুন

বন্ধ থাকা প্রয়াসসহ বাকি পাঁচটি নিরাময় কেন্দ্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান, প্রত্যয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক ইনজামামুল হক এবং চারটিতে চিকিৎসক শাকিল আহমেদ আছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তবে শনি ও রোববার দুপুরে তাঁদের সেখানে পাওয়া যায়নি। তাঁরা সবাই খণ্ডকালীন চিকিৎসক।

মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। তাই সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে মনোচিকিৎসক হিসেবে আমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি কেন্দ্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় দিই। ওষুধের পাশাপাশি রোগীদের উৎসাহ দিই।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দক্ষিণ পৈরতলায় অবস্থিত অশ্রু মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রাখার বিষয়ে প্রত্যয় ও প্রত্যাশা নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক জামাল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক অভিভাবক সন্তানদের বেঁধে নিয়ে এসে কান্না করেন। নিরুপায় হয়ে তাদের রাখতে হয়।’

পূর্ণকালীন চিকিৎসক না রাখার বিষয়ে অশ্রু মাদক নিরাময় কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, স্থায়ী চিকিৎসক রাখার বাস্তবতা নেই। কারণ, একজন রোগীর কাছ থেকে দুই মাসের জন্য ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। স্থায়ী চিকিৎসককে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন দিতে হবে। এত টাকা দিয়ে চিকিৎসক রাখা সম্ভব নয়।

নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি বলে নিশ্চিত করেন জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় মাদকাসক্তের সংখ্যা বেশি। ১০ ও ২০ শয্যার নিরাময় কেন্দ্র হওয়ায় খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়েই চলছে চিকিৎসা। পরিদর্শন আরও জোরদার করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে