জিআই পণ্য ‘বোইষা দই’ এর ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে

ভোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন দধি ব্যবসায়ীরা। গত বুধবার তোলাছবি: প্রথম আলো

ঈদ এলেই ভোলার ঐতিহ্যবাহী মহিষের দধি বা ‘বোইষা দই’-এর চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সরকারি সহায়তার অভাব ও উৎপাদন–ঘাটতিতে এই চাহিদা মানসম্মত দুধ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সুযোগ নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ঘোষ ও আড়তদারেরা। ভেজাল মিশিয়ে দই তৈরি করছেন এবং একই সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছেন দাম। এতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ভোলার দইয়ের ঐতিহ্য।

স্বাদের স্মৃতিতে হতাশা
ভোলা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক ও কবি আল মনির বলেন, ‘ছোটবেলার মহিষের দধির সেই স্বাদ এখন আর নেই। নিজের হাতে দুধ দোহন করে মাটির পাত্রে বসালে যে দই হতো, উল্টে দিলেও পড়ত না, কোনো পানি জমত না, সেই স্বাদ এখন হারিয়ে গেছে।’

দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের সদস্য ফারুক দৌলত বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন এলে মহিষের দধি খাওয়ানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখন আর সেই বোইষা দইয়ের ঐতিহ্য নেই।’

৮০০ বছরের ঐতিহ্যের ইতিহাস
ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ বছর আগে মেঘনা নদী ও সাগরের মোহনায় জেগে ওঠা চরাঞ্চলেই ভোলার সূচনা। মানুষের বসতি গড়ার আগেই সেখানে মহিষ পালন শুরু হয়। সেই সময় থেকেই মহিষের দুধে দধি বসানোর প্রচলন রয়েছে। মাটির হাঁড়িতে কাঁচা দুধ বসিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই দধির ওপর জমে ঘন মাখনের স্তর, যা এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই ঐতিহ্যবাহী ‘বোইষা দই’ ২০২৫ সালের মে মাসে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

দুধের বাজারে অস্থিরতা, খামারিরা বঞ্চিত
মহিষের মালিকেরা সারা বছর একই দামে দুধ বিক্রি করলেও ঈদ-পূজার সময় বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। ৯০-১০০ টাকার মহিষের দুধ ঈদে বেড়ে ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর দুধও ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০-১১০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে দেড় কেজি দধির দাম ২৫০-৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০-৩৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রে ওজনেও কম দেওয়া হচ্ছে।

মহিষ মালিক ফিরোজ মিয়াজি বলেন, ‘আমাদের সারা বছর নির্ধারিত দামে দুধ দিতে হয়, কিন্তু বাজারে সেই দুধই অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়।’

মো. মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ‘চরে ঘাস সংকটে দুধ উৎপাদন কমে গেছে। ঘোষ সারা বছর ৬০ টাকা কেজি দরে দুধ নেয়, অথচ আমরা বাড়িতে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে পারি।’ জসিম উদ্দিন মাস্টার বলেন, ‘আমাদেরও ১২ মাস ৮০ টাকা কেজি দরে দুধ দিতে হয়।’


সিন্ডিকেট ও ভেজালের অভিযোগ
গরুর খামারি মো. ইমরোজ আলম বলেন, ‘রোজার আগে দুধের দাম ছিল ৬৫-৭০ টাকা, এখন তা ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি করছি। বাজারে ভেজাল থাকায় অনেকে সরাসরি খামার থেকে দুধ কিনছেন।’

মিষ্টি ও দধি বিক্রেতাদের অভিযোগ, আড়তদারেরা সিন্ডিকেট করে দুধে ভেজাল মেশাচ্ছেন ও দাম বাড়াচ্ছেন। তবে আড়তদার মো. অলিউল্লাহ ঘোষ বলেন, চর থেকে দুধ আনতে কেজিতে ২০-৩০ টাকা খরচ হয়। ঈদে চাহিদা বাড়লেও অন্য সময় দুধ বিক্রি হয় না। অনেক সময় ফেলে দিতেও হয়। ঘাস–সংকটে উৎপাদনও কমে গেছে।

চাহিদা-সরবরাহের ঘাটতি
ভোলার ৭ উপজেলায় অন্তত ৫০০ দোকানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার পাত্র দধি বিক্রি হয়, যা ঈদে দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়ে যায়। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার মহিষের দুধের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন মাত্র ৮-১০ হাজার লিটার। ফলে এই ঘাটতি পূরণে গরুর দুধের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সমাধানে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ
ভোলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে আমাদের চেষ্টা রয়েছে। তবে উৎপাদন কম ও চাহিদা বেশি হওয়ায় এটি কঠিন।’ তিনি চারণভূমি সৃষ্টি, সরকারি জমি বরাদ্দ, উন্নত জাতের মহিষ সরবরাহ, পশু চিকিৎসাসেবা জোরদার এবং বাথান আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মহিষের মালিকদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভোলার জিআই স্বীকৃত ‘বোইষা দই’ একসময় শুধু নামেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।