ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি রেললাইন ঠিক আছে, পাশেরটি বেঁকে গেল কেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি পরপর দুবার রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুবারই ঢাকামুখী রেললাইনটি বেঁকে যায়। এই পথ আপলাইন হিসেবে পরিচিত। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী পাশের রেললাইন, যেটি ডাউনলাইন হিসেবে পরিচিত, সেই পথ দিয়ে ঠিকঠাক ট্রেন চলছে। একই তাপমাত্রায় পাশাপাশি দুই রেললাইন; একটা গরমে বেঁকে গেছে, আরেকটি ঠিকঠাক আছে, এটা কেন ঘটল?
রেল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রেললাইন বেঁকে যাওয়ার তিনটি কারণ সামনে এনেছেন। প্রথম কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, অতিরিক্ত তাপ। দিনের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে রেললাইনে সেটা ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তাপমাত্রা বেশি হলে রেলের পাত প্রসারিত হয়ে বেঁকে যাওয়ার (বাকলিং) ঝুঁকি থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাপ তো আপ আর ডাউন—দুটি লাইনই সমান পেয়েছে; তাহলে একটি কেন বেঁকে গেল, ঠিক তার পাশের লাইনেরটি কেন বাঁকল না?
দুই নম্বর কারণ হিসেবে রেলের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপলাইনের রেল ৭৫ পাউন্ডের (৩ ফুটের ওজন ৭৫ পাউন্ড)। উল্লেখ্য, ডাউনলাইনের রেলপথও ৭৫ পাউন্ডের। আর তিন নম্বর কারণ হলো, আপলাইনে রেলের মধ্যে ফাঁক রাখা হয়েছে দূরে দূরে, ২ দশমিক ২ কিলোমিটার পরপর। আর ডাউনলাইনে ফাঁক রাখা হয়েছে ঘন ঘন, ১২৬ ফুট পরপর।
তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সামছুল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেললাইন বেঁকে যাওয়ার কারণ হিসেবে এই তিন কারণকেই বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধান, রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহারে গাফিলতির কারণেই রেললাইন বেঁকে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে একটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দারিয়াপুর এলাকায় মালবাহী ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ৫০০ মিটার রেললাইনের স্লিপার ভেঙে লাইন বেঁকে যায়। এতে পরের দিন শুক্রবার রাত পর্যন্ত ঢাকামুখী রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী রেললাইন দিয়ে চলে সব ট্রেন। গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় দারিয়াপুর এলাকায় ঢাকামুখী রেললাইন আবার বেঁকে যায়। এতে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেটের সঙ্গে ঢাকামুখী রেললাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী রেলপথ দিয়ে চলে সব ট্রেন। পরে ঢাকামুখী আপলাইন রেললাইনে ১২৬ ফুট পরপর ৮টি জায়গা কেটে ফিশপ্লেট বসানো হয়।
গত শনি ও গতকাল রোববার সদর উপজেলার দারিয়াপুর, ছোট হরণ ও বড় হরণের রেললাইন এলাকায় বিভিন্ন পদে কর্মরত রেলের অন্তত সাতজনের সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিবেদক কথা বলে এসব তথ্য পান।
রেললাইন বেঁকে যাওয়া প্রসঙ্গে আখাউড়া রেলওয়ে জংশনের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে রেললাইন বারবার বেঁকে যাচ্ছে। রাজশাহী, পাবনাসহ অন্য জায়গার তাপমাত্রা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চেয়ে বেশি এবং সেখানে রেললাইন বেঁকে যাচ্ছে না কেন; জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেললাইন ৭৫ পাউন্ডের। রাজশাহী, পাবনাসহ অন্য জায়গায় রেললাইন ৯০ পাউন্ডের বা এর বেশি।
আসল কারণ কী, জানালেন অধ্যাপক সামছুল হক
কিন্তু এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহনবিশেষজ্ঞ সামছুল হক। তিনি প্রথম আলোকে টেলিফোনে বলেন, ৭৫ পাউন্ডের চেয়ে ৯০ পাউন্ড রেললাইন তাপে প্রসারিত হবে বেশি। কারণ, তাতে বেশি ইস্পাত আছে। রেল ৭৫ নাকি ৯০ পাউন্ড, তার সঙ্গে বেঁকে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আর তাপে প্রসারিত হয়ে বেঁকে যাওয়া রোধ করতে রেললাইনের মধ্যে ফাঁক কত দূর পরপর রাখা হবে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিয়ম আছে। এখন ফাঁক ছাড়াও রেললাইন হয়। রেললাইনের মধ্যে ফাঁক রাখলে ট্রেনের গতি কমে যায় এবং শব্দ হয়, ক্ষয় বেশি হয়। আজকাল অনেক দেশেই আর রেললাইনের মধ্যে ফাঁক রাখা হয় না। আমাদের দেশেও জোড়া ছাড়া লম্বা রেল আছে। প্রথম বসানো হয় যমুনামুখী লাইনে ১৯৯৮ সালে।
তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আপলাইন বেঁকে গেল কেন? এ প্রশ্নের জবাবে সামছুল হক বলেন, পাশাপাশি দুটি রেললাইনের ছবি দেখলেই কারণ সহজে বোঝা যাচ্ছে। একটায় রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে ভালো, আরেকটায় হয়নি। রেলের স্লিপার হতে হবে কংক্রিটের, নিচের পাথর ঠিকঠাক থাকতে হবে, রেলকে স্লিপারের সঙ্গে যুক্ত রাখার উপকরণ সঠিক হতে হবে, সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত ও নিয়মমতো তত্ত্বাবধান করতে হবে। তা করা হয়নি বলেই আপলাইন বেঁকে গেছে। আর ডাউনলাইনটায় নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে হয়েছে বলে তা বাঁকেনি।
আখাউড়া রেলওয়ে জংশনের প্রকৌশল (পথ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলের প্রথম দিন থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে রেললাইনে তাপমাত্রার পরিমাণ সব সময়ই ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। এ কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে ১১ এপ্রিল থেকে লোকোমাস্টারদের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথের বিভিন্ন অংশে গতি কমিয়ে ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে আশুগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার (যাওয়া-আসা ৬২ কিলোমিটার) এবং ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথের আখাউড়া থেকে বিজয়নগরের মুকুন্দপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার (যাওয়া-আসা ২৮ কিলোমিটার) অংশ আখাউড়ার পিডব্লিউআইয়ের আওতায় পড়েছে। পিডব্লিউআইয়ের অধীন রেললাইন ঠিক আছে কি না, তা ঘুরে দেখার জন্য জনবল নিযুক্ত আছে। এখানে আন্তনগর ও লোকাল ট্রেনকে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার গতিতে এবং মালবাহী ট্রেনগুলোকে ৩০ কিলোমিটার গতিতে চালাতে নির্দেশনা দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
আখাউড়া রেলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাকলিং (বেঁকে যাওয়া) রোধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণের (প্যাট্রোলিং) ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেললাইন ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করছি। রেলপথের প্রতি ছয় কিলোমিটার এলাকায় একটি দল থাকে। সেই দলে তিনজন করে আছেন। প্রতিটি দল প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে বালতি, লাল নিশানসহ যন্ত্রপাতি নিয়ে রেললাইন পাহারা দিচ্ছে।’