কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করে হিন্দু ভোট টানার কৌশল কাজে আসেনি জামায়াতের

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীছবি: সংগৃহীত

খুলনা–১ (দাকোপ–বটিয়াঘাটা) আসনে ঐতিহাসিকভাবে একাধিকবার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হয়েছেন। হিন্দু ভোটারের আধিক্যও রয়েছে আসনটিতে। এ কারণে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করে। দলটির আশা ছিল, হিন্দু ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করা যাবে। তবে ভোটের মাঠে সেই কৌশল কার্যকর হয়নি।

এই আসনের হিন্দু ভোটারের আধিক্য থাকা ইউনিয়নগুলোতে জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি। শতাংশের বিচারে খুলনা জেলায় সবচেয়ে বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস দাকোপ উপজেলায়। সেখানে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী। বটিয়াঘাটার হিন্দু ভোটারের আধিক্য থাকা ইউনিয়নগুলোতেও বড় ব্যবধানে হেরেছেন তিনি।

হিন্দু ভোটার–অধ্যুষিত আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খুলনা–১ আসনে এবার প্রথমবারের মতো বিএনপি জয় পেয়েছে। চতুর্থবারের মতো প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান।

এবারের নির্বাচনে শুরু থেকেই হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচার চালান আমীর এজাজ খান। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে আগের তিনবারের পরাজয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে সমর্থন চান তিনি।

অন্যদিকে প্রথমবারের মতো হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করে জামায়াত নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। কৃষ্ণ নন্দী এই এলাকার ভোটার ছিলেন না। প্রচারে তিনি হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

৫০ শতাংশের বেশি ভোট বিএনপির

খুলনা–১ আসনের ২টি উপজেলায় রয়েছে ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। দুটি উপজেলাতেই বিএনপির প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন।

আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪ হাজার ২৩৭ জন। বটিয়াঘাটায় ভোটার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৭ জন, দাকোপে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭০ জন। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দাকোপ উপজেলায় হিন্দু জনসংখ্যার হার ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বটিয়াঘাটায় ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৫০৭টি। এর মধ্যে বটিয়াঘাটায় বৈধ ভোট ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৬টি এবং দাকোপে ৯১ হাজার ১১টি (পোস্টাল বাদে)।

বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৯২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৬৫৮ ভোট।

দাকোপে আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৮২৫ ভোট, যা ওই উপজেলার বৈধ ভোটের প্রায় ৬৬ শতাংশ। বটিয়াঘাটায় তিনি পেয়েছেন ৬০ হাজার ২৬৭ ভোট, যা বৈধ ভোটের প্রায় ৫২ শতাংশ।

অন্যদিকে কৃষ্ণ নন্দী দাকোপে পেয়েছেন ২২ হাজার ৫৬১ ভোট (প্রায় ২৫ শতাংশ) এবং বটিয়াঘাটায় ৪৭ হাজার ৯৭ ভোট (প্রায় ৪১ শতাংশ)।

বটিয়াঘাটায় তুমুল প্রতিযোগিতা

খুলনা–১ আসনের দুই উপজেলার মধ্যে বটিয়াঘাটায় এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ভোটের ব্যবধানও এখানে ছিল কম, একাধিক ইউনিয়নে জয়–পরাজয়ের ব্যবধান ছিল কয়েক শ ভোটের মধ্যে।

জেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন জলমায় আমীর এজাজ খান ৯৯৮ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। ভান্ডারকোট ইউনিয়নে তাঁদের ব্যবধান ছিল মাত্র ৭০ ভোট এবং এজাজের নিজ ইউনিয়ন আমিরপুরে ব্যবধান ছিল ২৪০ ভোট। অন্যদিকে বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নে তিনি পরাজিত হন।

দাকোপে জামায়াতের কৌশল কার্যকর হয়নি

দাকোপে হিন্দু ভোটারের হার তুলনামূলক বেশি হলেও জামায়াতের কৌশল পুরোপুরি কাজে আসেনি। কৃষ্ণ নন্দী এখানে পেয়েছেন ২২ হাজার ৫৬১ ভোট, যা বৈধ ভোটের প্রায় ২৫ শতাংশ। বিপরীতে আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৮২৫ ভোট, যা প্রায় ৬৬ শতাংশ।

দাকোপের ৯টি ইউনিয়ন ও চালনা পৌরসভায় আমীর এজাজ খান সব জায়গায় জয়ী হন এবং মোট ব্যবধান দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ২৬৪ ভোট। পানখালী ছাড়া অন্য কোনো এলাকায় বড় ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হিন্দু ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রার্থী দেওয়া হলেও জামায়াতের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি তাদের প্রত্যাশিত সুবিধা এনে দিতে পারেনি।

আরও পড়ুন

ইউনিয়নভিত্তিক ফলাফল

বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নে আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ১৯ হাজার ২০২ ভোট, বটিয়াঘাটা সদর ইউনিয়নে ৮ হাজার ৮১৮, গঙ্গারামপুরে ৭ হাজার ৪২০, সুরখালীতে ৯ হাজার ৫৭৯, ভান্ডারকোটে ৫ হাজার ১৫২, বালিয়াডাঙ্গায় ৪ হাজার ৫৫৬ এবং আমিরপুরে ৫ হাজার ৫৪০ ভোট।

একই উপজেলায় কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন জলমায় ১৮ হাজার ৪০৪, বটিয়াঘাটা সদরে ১ হাজার ৯৫২, গঙ্গারামপুরে ২ হাজার ৭২১, সুরখালীতে ৬ হাজার ৮৮৮, ভান্ডারকোটে ৫ হাজার ৮২, বালিয়াডাঙ্গায় ৬ হাজার ৭৫০ এবং আমিরপুরে ৫ হাজার ৩০০ ভোট।

দাকোপ উপজেলার চালনা পৌরসভায় আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ৫ হাজার ৬২ ভোট। পানখালীতে ৫ হাজার ২৬১, দাকোপ সদরে ৩ হাজার ৭৭২, লাউডোবে ৪ হাজার ৩১০, কৈলাশগঞ্জে ৬ হাজার ৩৫১, সুতারখালীতে ৮ হাজার ৯১৪, কামারখোলায় ৪ হাজার ৭২২, তিলডাঙ্গায় ৭ হাজার ২৮৮, বাজুয়ায় ৭ হাজার এবং বাণীশান্তায় ৭ হাজার ১৪৫ ভোট।

অন্যদিকে কৃষ্ণ নন্দী চালনা পৌরসভায় পেয়েছেন ২ হাজার ৯১৫, পানখালীতে ৪ হাজার ৪৪, দাকোপে ৩২১, লাউডোবে ৮৮৫, কৈলাশগঞ্জে ১ হাজার ৫, সুতারখালীতে ৫ হাজার ২৯৩, কামারখোলায় ২ হাজার ৬৫৯, তিলডাঙ্গায় ২ হাজার ৪৫৯, বাজুয়ায় ১ হাজার ৩৮২ এবং বাণীশান্তায় ১ হাজার ৫৯৮ ভোট।