যে ঘরে ওঠার কথা ছিল, তার সামনেই সাজুর শেষ ঠিকানা

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের বরেয়া গ্রামে নিহত এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর বাড়িতে শোকাহত স্বজন ও গ্রামবাসীর ভিড়। বাড়ির আঙিনায় চলছে তাঁর দাফনের প্রস্তুতি। শনিবার দুপুরে তোলা ছবিপ্রথম আলো

একতলা বাড়ির সামনে স্তূপ করে রাখা নতুন ইট। দোতলার ঘর নির্মাণের প্রস্তুতি চলছিল। অথচ সেই বাড়ির সামনেই খোঁড়া হয়েছে একটি কবর। বাড়ির ফটকে বড় করে লেখা—‘সরদার বাড়ি’। যে ঘরে ওঠার কথা ছিল এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর, সেই ঘরের সামনেই তৈরি হয়েছে তাঁর শেষ ঠিকানা।

আজ শনিবার দুপুরে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামে সাজুর বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা গেল। কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাজুর মরদেহ পৌঁছায় বেলা সোয়া ২টায়। বাড়ির উঠানে তখন স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিত মানুষের ভিড়। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ আবার মনে করছিলেন সাজুর সঙ্গে কাটানো দিনের কথা।

আরও পড়ুন
এস এম আলিমুজ্জামান সাজু
ছবি: সংগৃহীত

ভোমরা স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি সাজুর বাড়িতে পৌঁছায়। গেট পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স উঠানে ঢোকার পর মরদেহ নামানো হয়। উঠানের এক পাশে কালো মশারি টাঙিয়ে গোসল করানোর ব্যবস্থা করা হয়। স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকে শেষবারের মতো সাজুকে দেখতে চাইলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গোসলের পর মরদেহ দেখানো হবে। এর মধ্যেই ঘরের ভেতর থেকে নারীদের কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

বেলা ২টা ১৫ মিনিটের দিকে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। বাড়ির সামনে খোঁড়া কবরটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেন কয়েকজন। আসরের নামাজের পর সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সামনে সাজুর জানাজা হওয়ার কথা। এরপর নতুন বাড়ির সামনেই তাঁকে দাফন করা হবে বলে জানান তাঁর বড় ভাই সাহেব সরদার।

সাজু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমাদের একসঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে। আজ সেসব খুব মনে পড়ছে। জীবনে এমন বন্ধু আর পাব না। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ—কোনো কিছুতেই তাঁর কাছে ভেদাভেদ ছিল না। কলকাতা যাওয়ার আগেও ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আর আজ বাড়ির আঙিনায় ওর কবর হচ্ছে। খুব কষ্ট লাগছে।
ভবেশ ঘোষ, এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর বন্ধু

সাজু ছিলেন মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী। এলাকায় তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ছিল। প্রতিবেশীরা বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন সাজু। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ না করে সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল তাঁর। তাই সাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বরেয়া গ্রামের মানুষ তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন।

গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর বাড়ির আঙিনায় খোঁড়া হচ্ছে কবর। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা
ছবি: প্রথম আলো

সাজুর ছোটবেলার বন্ধু ভবেশ ঘোষও এসেছিলেন বাড়িতে। সনাতন ধর্মাবলম্বী ভবেশ বসে ছিলেন সাজুর বাড়ির উঠানে। তিনি বলেন, ‘সাজু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমাদের একসঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে। আজ সেসব খুব মনে পড়ছে। জীবনে এমন বন্ধু আর পাব না। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ—কোনো কিছুতেই তাঁর কাছে ভেদাভেদ ছিল না। কলকাতা যাওয়ার আগেও ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আর আজ বাড়ির আঙিনায় ওর কবর হচ্ছে। খুব কষ্ট লাগছে।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরের কাছে আমার একটাই কামনা, সাজুর আত্মার যেন কল্যাণ হয়।’

সাজুর প্রতিবেশী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আলিমুজ্জামান সাজুর মৃত্যুতে পুরো গ্রামের মানুষ শোকাহত। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই তাঁর মৃত্যুতে মর্মাহত। তিনি অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আজ এমন একজন মানুষ আমাদের মাঝ থেকে চলে যাওয়ায় আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’

সাজুর বড় ভাই সাহেব সরদার সকাল থেকেই বাড়িতে ছিলেন। ভোমরা স্থলবন্দরে যাননি। কবর খনন ও দাফনের আনুষঙ্গিক কাজ তদারক করছিলেন তিনি।

সাহেব সরদার বলেন, ‘আজ শনিবার আসরের নামাজের পর আমাদের বাড়ির পাশের সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সামনে ছোট ভাই সাজুর জানাজা হবে। ওর নতুন বাড়ির সামনেই কবর দেওয়া হচ্ছে। আমি বড় ভাই, অথচ আমার আগেই ছোট ভাইটা চলে গেল—এটা আমার জন্য খুবই কষ্টের। ও বিয়ে করেনি, আমরাই ছিলাম ওর পরিবার, সবকিছু।’

সাজুর বাড়িটির দেখাশোনা করতেন ইসমাইল হোসেন। ভারতে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন সাজু। বাড়ির সামনে রাখা নতুন ইটগুলোও সেই কাজের জন্য আনা হয়েছিল।

ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ইটও এনে রাখা হয়েছে। সাজু ভাই বলেছিলেন, “আমি ইন্ডিয়া থেকে আসি, তারপর কাজে হাত দেব।” কিন্তু ভাই আসল ঠিকই, তবে মৃত লাশ হয়ে।’ কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি।

এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে পৌঁছালে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়
ছবি: প্রথম আলো

এর আগে আজ সকাল থেকেই সাজুর স্বজনেরা ভোমরা স্থলবন্দরে মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার পিস ওয়ার্ল্ড হিমঘর থেকে সড়কপথে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি ভোমরা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা ইমিগ্রেশন এলাকায় পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুর ১২টার দিকে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ মরদেহটি ভোমরা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।

একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের তেঁতুলিয়া গ্রামের রেবতী সরকারের মরদেহ দেশে আনা হয়নি। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলকাতাতেই তাঁর সৎকার করা হয়েছে। রেবতীর ছেলে অনিক সরকার জানান, গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে কলকাতার নিমতলা শ্মশানে রেবতী সরকারের সৎকার সম্পন্ন হয়।

১৯ আগস্ট ভোরে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে আগুন লাগে। এতে ৯ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে সাতক্ষীরার সাজু ও রেবতী সরকার ছাড়াও কুষ্টিয়ার চারজন ও ঢাকার একজন আছেন। বাকি পাঁচজনের মরদেহ আজ যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে।