বাবার মুখে গল্প শুনে খুঁজে বের করলেন ১৩৩ বছরের পুরোনো আত্মীয়তা

৯০ বছর বয়সী পিসি পার্বতী রানী পালের সঙ্গে শিক্ষক অশোক রঞ্জন পাল। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গৌরাঙ বস্তি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

ভালো জীবিকার আশায় প্রায় দেড় শ বছর আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিলেট অঞ্চলের চা–বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন অশোক রঞ্জন পালের পূর্বপুরুষেরা। সময়ের ব্যবধানে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ১৩৩ বছর পর সেই শিকড়ের সন্ধানে ভারতে গিয়ে স্বজনদের খুঁজে পান মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার এই শিক্ষক।

অশোক রঞ্জন পাল (৫৬) জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর বাড়ি পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে। তিনি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা একসময় ধামাই চা–বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে বাগানের পাশের কৃষ্ণনগর এলাকায় জমি কিনে বসতি গড়েন।

অশোক বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা অজিত কুমার পাল ও বড় পিসির মুখে শুনতেন নিজেদের আদিবাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার জয়পুর থানার বারোবেন্দা গ্রামে। ওই অঞ্চল খরাপ্রবণ হওয়ায় জমিতে ভালো ফসল হতো না। দারিদ্র্যের কারণে তাঁর প্রপিতামহ পান্ডু কুমারের পরিবার ব্রিটিশ আমলে কাজের খোঁজে আসামের চা–বাগানে চলে আসেন। সে সময় সিলেট অঞ্চল আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য তথ্যের সূত্র ধরে অশোক ২০১৩ সালে পাসপোর্ট–ভিসা করে দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যান। বারোবেন্দা গ্রামে গিয়ে পান্ডু কুমারের বংশধরদের খোঁজ শুরু করেন। সেখানে পান্ডুর ছোট ভাইয়ের নাতি মকরু কুমারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের খুঁজে পাওয়ার ঘটনায় সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে তিনি গ্রামে অন্য আত্মীয়দের বাড়িতেও যান এবং তাঁদের সঙ্গে সময় কাটান।

আরও পড়ুন

অশোক বলেন, ‘বারোবেন্দার পূর্বপুরুষদের ভিটা থেকে একমুঠো মাটি নিয়ে এসেছিলাম। বাড়িতে এনে বাবাকে দিলে তিনি সেই মাটি মাথায় ছুঁইয়ে খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।’

পরে ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের সেই স্বজনদের কয়েকজন জুড়ীতে অশোকদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। কয়েক দিন অবস্থান করেন। স্থানীয় কুমার সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর পর থেকে দুই দেশের আত্মীয়দের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।

জুড়ীর বিনন্দপুর এলাকায় কুমার সম্প্রদায়ের ৮০ বছরের একান্নবর্তী পরিবার নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সম্প্রতি ওই পরিবারকে দেখতে যান সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস। তাঁর বাড়িও পশ্চিমবঙ্গে। বিনন্দপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে সহকারী হাইকমিশনার অশোকের এ প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, ‘এটা আমাকে বিমোহিত করেছে। দীর্ঘদিন পর অশোক তাঁর আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছেন।’

আরও পড়ুন