পুলিশের কাছ থেকে লাখো ইয়াবা উদ্ধার নিয়ে তদন্তে দুই রকম তথ্য
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়ার সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হলেও আদালতে দেওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর কাছ থেকে কোনো ইয়াবা উদ্ধার করা হয়নি। অর্থাৎ দুবার দুই রকমের তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর নগরের বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ইমতিয়াজ ও তাঁর সহকর্মী আবু সায়েমের মধ্যে হওয়া একটি মুঠোফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বাকলিয়া থানার ৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। পরে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর হোসেন, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না। একই সঙ্গে কক্সবাজার জেলা পুলিশ কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেন। গত ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ নিজে বাদী হয়ে মামলা করেন। আদেশে বলা হয়, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’-এর ৪৬ ধারায় অপরাধটি আমলযোগ্য হলেও বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা না করে পিআরবির ২৪৪ বিধি লঙ্ঘন করে পুলিশ আইনের ২৯ ধারার অপরাধ করেছেন।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, আলামত উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও কেন এফআইআর রেকর্ড করা হয়নি, কেন জব্দ তালিকা প্রস্তুত হয়নি এবং মাদক গোপনে অন্যত্র হস্তান্তর করে অভিযুক্তকে কোনো বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয় তদন্ত করতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়াকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার দিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত না থাকায় সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ থেকেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার ১২ দিন পর ফুটেজ চাওয়া হওয়ায় তা আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বাসচালকের সহকারী ও আশপাশের দোকানদারদের জিজ্ঞাসাবাদেও ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কনস্টেবল ইমতিয়াজ ও তাঁর সহকর্মী আবু সায়েমের মধ্যে হওয়া কথোপকথনটি ছিল ‘মশকরা’। সায়েমের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ায় সেটি ছড়িয়ে পড়ে।
আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, তিনি অভিযানে আছেন, এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রথমে স্বীকার, পরে অস্বীকার
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার পর কনস্টেবল ইমতিয়াজ প্রথমে স্বীকার করেন যে কক্সবাজারের মোশাররফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাঁকে বাড়তি আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একটি ট্রলি ব্যাগ ঢাকায় পৌঁছে দিতে বলেন। এ জন্য তাঁকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ৮ ডিসেম্বর ওই ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ঢাকাগামী বাসে ওঠেন তিনি। বাসটি নতুন ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে তাঁর ট্রলি ব্যাগে ইয়াবা পাওয়া যায়। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে ক্ষমা চাইলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে নতুন ব্রিজ থেকে অলংকার মোড় যাওয়ার পথে ট্রলি ব্যাগটি ফেলে দেন বলে তিনি জানান।
তবে পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি তাঁকে নিয়ে কক্সবাজারে গেলে তিনি আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। নতুন বক্তব্যে বলেন, তল্লাশির সময় তাঁর ব্যাগে কিছু পাওয়া যায়নি। মোশাররফ নামের কাউকে তিনি চেনেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবাসহ পাওয়া পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ৯ জনকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে আদালতে দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে ইয়াবা না পাওয়ার কথা উল্লেখের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই।