মামলার এজাহারে লুঙ্গি পরা ব্যক্তির ‘প্যান্টের পকেট’ থেকে মাদক উদ্ধারের দাবি

ফরিদপুরে ‘ডিবির হেফাজতে’ ছাত্রলীগ কর্মী ইশতিয়াকের আটকের মুহূর্তের ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মারা যাওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে (২৮) মাদকসহ আটকের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ডিবির দায়ের করা মামলার এজাহারে লুঙ্গি পরা ব্যক্তির ‘প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা’ উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া এজাহারে আরও অসংগতি দেখা গেছে। গত ২১ জুন সকালে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন ফরিদপুর ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান। ওই দিনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইশতিয়াক।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্য ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামি ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ডিবির সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। এ সময় এ মামলার সাক্ষী মধুখালী মরিচ বাজার এলাকার ব্যবসায়ী বিনয় কুমার সাহা (৬২), সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের (বর্তমান ঠিকানা নূরুজ্জামান বোডিং হাউস মধুখালী মরিচ বাজার) মো. আলমগীর হোসেন (৪২) ও ডিবির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. হাজিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ইশতিয়াক স্বীকার করেন, তাঁর কাছে গাঁজা আছে। তখন তিনি তাঁর প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১০০ গ্রাম গাঁজা নিজ হাতে বের করে দেন। অথচ আটক হওয়ার সময় ইশতিয়াকের পরনে ছিল লুঙ্গি।

২০ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লায় নিজের বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে ডিবি পুলিশ। ওই ঘটনার পরে ইশতিয়াকের আটক ও গাঁজা উদ্ধারের ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাটি রাতের নয়, দিনের বেলায়। আরও দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা ইশতিয়াককে থাপ্পড় দিচ্ছেন এবং তাঁর দেহ তল্লাশি করছেন। পরে ইশতিয়াকের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি বস্তু দেখে ডিবি সদস্যদের বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এক পোঁটলা’।

দুই সাক্ষীর বয়ান

ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে মামলার দুই সাক্ষীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে ডিবি পুলিশের মামলার বিবরণের কোনো সংগতি পাওয়া যায়নি।

সাক্ষী মো. আলমগীর হোসেন আজ শনিবার বেলা পৌনে একটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, মামলায় পুলিশ ঘটনাস্থল হিসেবে যে স্থানের কথা উল্লেখ করেছে, তিনি (আলমগীর হোসেন) সেখানে ছিলেন না। ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিনি মামলার আরেক সাক্ষী ব্যবসায়ী বিনয় কুমার সাহার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই সময় দুই থেকে তিনটি মোটরসাইকেলে পুলিশ আসে। তাঁর পরিচয় জানতে চায় এবং বাড়ির ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর লিখে নেয়। পরে আলমগীর জানতে পারেন, তাঁকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার অপর সাক্ষী বিনয় কুমার সাহার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন তাঁর ছেলে বাঁধন সাহা। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তাঁর বাবা মরিচ বাজারের ভেতরে এক কোনায় তাঁদের দোকানে ছিলেন, যা ঘটনাস্থল থেকে বেশ দূরে (আনুমানিক ১০০ মিটার)। বাঁধন বলেন, ‘ইশতিয়াককে ধরেছে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে। আমাদের দোকান মরিচ বাজারের ভেতরে। বাবা দোকানে ছিলেন, পরে পুলিশ আসে। পুলিশ বাবাকে সাক্ষী হতে বলে। বাবা স্বাক্ষর করতে রাজি হননি, তবে জোর করে কাগজে বাবার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।’

আরও পড়ুন

লুঙ্গি পরা ব্যক্তির প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা উদ্ধার

ডিবি পুলিশ যখন ইশতিয়াককে আটক করে, তখন তাঁর পরনে লুঙ্গি–জামা ও কাঁধে একটি ল্যাপটপের ব্যাগ ছিল। কিন্তু পুলিশের মামলায় গাঁজা উদ্ধারের বিবরণে বলা হয়, ইশতিয়াক তাঁর প্যান্টের ডান পকেট থেকে গাঁজা বের করে পুলিশকে দেন।

এ ছাড়া মামলার এজাহার অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া গাঁজা থেকে পাঁচ গ্রাম রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য রেখে বাকি গাঁজা মামলার আলামত হিসেবে জমা দেওয়া হয়। রাসায়নিক পরীক্ষার আগে উদ্ধার হওয়া বস্তু গাঁজা নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও মামলাটি হয়েছে মাদক আইনে।

আরও পড়ুন

মামলার এজাহারের এসব অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে আজ বেলা একটার দিকে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকদেব রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিবি পুলিশ এজাহার লিখে দিয়েছে। আমরা তা ২১ জুন সকাল সোয়া ছয়টায় মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছি। এজাহারের ভাষায় আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তারা যেভাবে লিখেছে, সেভাবে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার পর একমাত্র আসামির মৃত্যু হলে সেই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।’

সুকদেব আরও বলেন, গাঁজাসদৃশ বস্তু হলেও মাদক আইনে মামলা হয়। তবে রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদক প্রমাণিত না হলে তখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

আরও পড়ুন