গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে সারোয়ার হোসেন ও শাহরিয়ার তৌফিকের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক কর্মী হাসপাতালটির ভেতরে প্রবেশ করে এ হামলা ও ভাঙচুর চালান। ওই দিন বিকেলেই ছাত্রলীগের পাঁচজন নেতার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ জনকে আসামি করে বেলাব থানায় লিখিত অভিযোগ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে তিন দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেয়নি পুলিশ।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমা চাওয়ায় অভিযোগটি উঠিয়ে নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে বেলাব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূর আসাদ-উজ-জামান বলেন, ‘সেদিনের হামলা-ভাঙচুরের বিষয়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতারা ভুল স্বীকার করে আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। মন্ত্রী মহোদয়ও আমাদের অনুরোধ করেছেন তাঁদের ক্ষমা করে দিতে। সার্বিক বিষয়টি আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিতভাবে পাঠাব। সেখান থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়ার পরই লিখিত অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাদ্য ও পথ্য সরবরাহসংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেন ছাত্রলীগের সভাপতি সারোয়ার হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব দরপত্র বর্তমানে মূল্যায়ন কমিটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। দরপত্র অন্য কেউ পেয়ে যাচ্ছেন, এমন খবরে হাসপাতালে হামলা-ভাঙচুর চালায় ছাত্রলীগ।

আজ সকাল ১০টার দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বেলাব উপজেলা কমপ্লেক্স চত্বরে প্রবেশ করেন। এর আগে থেকেই হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করছিলেন হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সড়ক থেকে কমপ্লেক্স পর্যন্ত মানববন্ধন পার হয়ে ভেতরে যাওয়ার পর শিল্পমন্ত্রীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে হাসপাতাল কমপ্লেক্সের ভেতরে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়, সভা শেষে মন্ত্রী ব্রিফিং করবেন। পরে ব্রিফিং না করেই হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করেছেন তিনি।

সভায় শিল্পমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন নূরুল ইসলাম, রায়পুরা-বেলাব সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সত্যজিৎ কুমার ঘোষ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়শা জান্নাত, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তানভীর আহম্মেদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন নরসিংদীর সভাপতি মোজাম্মেল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুজ্জামান খান এবং উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সারোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার তৌফিক।

সভায় উপস্থিত থাকা কয়েকজন জানান, সভা শুরু হওয়ার পর মন্ত্রী স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে ওই দিনের ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। তারপর ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের বক্তব্য শোনেন তিনি। এ সময় সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বক্ত্যব্য দেন প্রশাসন, পুলিশ, চিকিৎসা সংগঠন ও স্থানীয় রাজনীতির কর্তাব্যক্তিরা। সব শুনে মন্ত্রী অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের তিরস্কার করেন এবং তাঁদের ক্ষমা চাইতে বলেন। পরে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সারোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার তৌফিক ভুল স্বীকার করে এ ধরনের কাজ আর কখনো করবেন না জানিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে ক্ষমা চান। এরপর বক্তব্য দেওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষি এ ঘটনার জন্য নিজেও ‘অনুতপ্ত’ জানিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দিতে অনুরোধ জানান শিল্পমন্ত্রী। দুপুর ১২টার দিকে সভা শেষে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘গণমাধ্যমে যেভাবে নিউজ হয়েছে, বিষয়টি এত বড় কিছু ছিল না। আমাদের গ্রুপিংয়ের কারণেই বিষয়টি এত বড় হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয়ের সামনে আমরা সকলের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি। বলেছি, আর কখনো এমন ভুল হবে না। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ভুল-বোঝাবুঝি শেষে বিষয়টি এখন সমাধান হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।’ একই কথা বলেন শাহরিয়ার তৌফিকও।
আজকের সভায় বিষয়টি মিটমাট হয়ে গেছে জানিয়ে বেলাব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তানভীর আহম্মেদ বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া লিখিত অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তও চলছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতারা। পুরো বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্যার অবগত আছেন। তাই সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া যে দরপত্র পাওয়া নিয়ে ঝামেলার সূত্রপাত, আমরা আজকের সভায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, সরকারি নিয়মনীতির বাইরে কিছুই হবে না।’

এদিকে সভা চলাকালে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল চত্বরে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপক্ষে ছিলেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি খালেদ মাহমুদের কর্মীরা ও অন্যপক্ষে বর্তমান সভাপতি সারোয়ার হোসেনের কর্মীরা। বর্তমান সভাপতি সারোয়ারের কয়েক কর্মী ওই সময় সভাস্থলে ঢুকতে গেলে বাধা দেন খালেদের কর্মীরা। এ নিয়ে দুই পক্ষই উত্তেজিত হয়ে উঠলে এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।