ভক্তদের উদ্দেশে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন অনুষ্ঠানের তারিখ ও স্থান। সিলেটের বৈরাগী বাজারে হজরত ছাবাল শাহ্ (রহ.)–এর মাজারের বার্ষিক ওরসে গান শোনার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সবাইকে। কিন্তু গান গেয়ে বাড়িতে আর জীবিত ফেরা হলো না উদীয়মান বাউল ও লোকশিল্পী পেহেলি ভৈরবীর।
আজ শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আরও আটজনের সঙ্গে পেহেলি ভৈরবীও নিহত হয়েছেন। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের চণ্ডীবের উত্তরপাড়ায়। উদীয়মান এই শিল্পীর মৃত্যুতে এলাকায় শোক নেমে এসেছে।
বিকেল ৫টা ৪ মিনিটের দিকে পেহেলি ভৈরবীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ির সড়কে এসে থামে। মুহূর্তেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মেয়েটা সুন্দর গান করত। বেঁচে থাকলে আরও অনেক মানুষকে গান শোনাতে পারত।’
এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি। আমার কী হইব? আমি কারে নিয়া থাকুম। কে আমারে গান শোনাইব।রোজিনা বেগম, পেহেলি ভৈরবীর মা
মরদেহের পায়ের কাছে বসে ছিলেন মা রোজিনা বেগম। কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি। আমার কী হইব? আমি কারে নিয়া থাকুম। কে আমারে গান শোনাইব।’
রোজিনা বেগম নিজেও একজন সংগীতশিল্পী। তিনিই ছিলেন মেয়ের প্রথম গানের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে গান শেখাতেন। মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে। রোজিনা বেগম বলেন, ‘রাত একটার সময় মেয়ের সঙ্গে কথা হইছে। বুঝতেই পারিনি, সকালে আর ওর সঙ্গে কথা বলতে পারব না।’
স্বজনেরা জানালেন পেহেলি ভৈরবীর প্রকৃত নাম ইসরাত জাহান। তবে মঞ্চ, ভক্ত–শ্রোতা, স্বজন ও এলাকায় পেহেলি ভৈরবী নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর ফেসবুক পেজটিও এই নামে। ফলোয়ার সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর, বিয়ে হয়নি। বাবা বাবুল মিয়া পেশায় ঠিকাদার। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে পেহেলি ছিলেন ছোট। ছোটবেলা থেকে মায়ের উৎসাহে গান শুরু করেন। তবে মঞ্চে নিয়মিত গান গাইছিলেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে। বাউল ও লোকগানই ছিল তাঁর প্রধান পরিচয়।
অল্প সময়েই সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন পেহেলি ভৈরবী। বছরের বিভিন্ন সময় অসংখ্য গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হতো তাঁকে। গতকালও গিয়েছিলেন গানের অনুষ্ঠানে। কোনো অনুষ্ঠানে তিনি একা যেতেন না। কখনো মা, কখনো বাবা সঙ্গে থাকতেন। এবার সঙ্গী ছিলেন বাবা বাবুল মিয়া। দুর্ঘটনায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে পেহেলি ভৈরবীর গান প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি গানের দর্শকসংখ্যা মিলিয়ন (১০ লাখ) ছাড়িয়েছে। তাঁর একটি অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ছিল ১০টি গান। পরিবার জানায়, গত এক বছরে গান গেয়ে তিনি ভালো সম্মানীও পেতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন সংগঠন থেকে পেয়েছেন সম্মাননাও।
পেহেলির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর বাড়ি ছুটে আসেন সহশিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা। সহশিল্পী উবায়দুল কাওয়াল বলেন, ‘পেহেলির গানের ধারা এক, আমারটা আরেক। ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখে ভালো লাগত। এত অল্প বয়সে একজন বাউলশিল্পীর চলে যাওয়া মানে মনের গান গাওয়ার একজন মানুষ কমে যাওয়া।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শেষবার অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেওয়া পোস্টে অনেকে শোক জানাচ্ছেন। শুভ সেন নামের একজন লিখেছেন, ‘প্রোগ্রামে দেখা হইলেই ভাইয়া কইয়া ডাক দিতেরে। তর ভাইয়া ডাকটা ভড্ড মিস করমু। পরপারে ভালো থাকিস রে বইন।’
পাঁচ বন্ধু ঘুরতে গিয়েছিলেন, ফিরলেন চারজন
একই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সাইফুল ইসলাম নামের কুলিয়ারচরের এক ব্যক্তি। পাঁচ বন্ধু মিলে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সাইফুল ছাড়া ফিরলেন অন্য চারজন।
সাইফুল ইসলাম (৫৫) পেশায় ঠিকাদার ছিলেন। রাজনীতি করতেন। তিনি কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা তিনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বুধবার চার বন্ধুর সঙ্গে সিলেট ভ্রমণে যান সাইফুল। দলের অন্য বন্ধুরা হলেন ফারুকুল ইসলাম, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আবদুল লতিফ। এর মধ্যে আহত আবদুল লতিফ ও ফারুকুল ইসলাম বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফারুকুল ইসলাম উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
আবদুল লতিফ বলেন, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ৩০ থেকে ৩৫ যাত্রী নিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সিলেট ছাড়ে। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তিনি বলেন, ‘বাসে উঠেই আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরে দেখি, বাস সড়কের নিচে। আমাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারি, আমার বন্ধু সাইফুল ইসলাম আর বেঁচে নেই।’
সাইফুল ইসলামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কুলিয়ারচরে শোক নেমে আসে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন।