জাবির প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের দাবিতে এক ছাত্রীর অবস্থান কর্মসূচি, সড়ক অবরোধ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি এবং এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন এক শিক্ষার্থী। গতকাল রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ের বারান্দায় তিনি অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। একই সঙ্গে ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার ও প্রশাসনের জবাবদিহির দাবিও জানিয়েছেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে থাকা ওই শিক্ষার্থীর নাম লামিশা জামান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। লামিশার ভাষ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা সূত্রে জানা যায়, রোববার সন্ধ্যায় দুই ছাত্রীকে গালিগালাজ ও অসংগতিপূর্ণ আচরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার এক যুবককে নিরাপত্তা কার্যালয়ে আনেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ক্যাম্পাসের বটতলা এলাকার ‘পেটুক’ নামক হোটেলের কর্মচারী মো. নাইম ভুক্তভোগী ছাত্রীকে বাজেভাবে স্পর্শ করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে অভিযুক্ত কর্মচারী নাইমকে আটক করে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় যৌন হয়রানির মামলা করেছে।
গতকালের ঘটনা এবং ১২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় দায় স্বীকার করে প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন লামিশা। আজ বিকেলে প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলমের কার্যালয়ের সামনের বারান্দায় বিছানা বিছিয়ে অবস্থান নিয়েছেন লামিশা। পাশেই বালিশ এবং কিছু খাবার রাখা রয়েছে। সহপাঠীসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর সঙ্গে বসে আছেন।
লামিশা জামান বলেন, ‘ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা এবং গতকাল আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের দাবিতে এখানে অবস্থান করছি। ধর্ষণচেষ্টা ঘটনার প্রতিবেদন ও প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাব।’
এ বিষয়ে মামলার বাদী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেফরুল হাসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ওই শিক্ষার্থীর অভিযোগ অনুযায়ী আশুলিয়া থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ওই মামলায় আসামিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
জাকসু নেতাদের সড়ক অবরোধ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ছয় দিনেও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নেতা-কর্মীরা। সোমবার বিকেলে ৪টা ৪০ মিনিটে ১৫ মিনিটের জন্য ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দুই লেনে অবরোধ করেন তাঁরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আরিচাগামী লেনে সমাবেশও করেন। এর আগে সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান তাঁরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি নিরাপদ ক্যাম্পাসে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার ছয় দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। অবিলম্বে আসামিকে তাঁরা গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।
জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলামের অভিযোগ, শিক্ষার্থীকে নিপীড়নের এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি অথচ আসামির স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে, তাঁর ছবি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রথমত মনে হচ্ছে এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যর্থতা যে তারা এখন পর্যন্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি; এই জায়গা থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন মহলকে এই আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে এই আন্দোলনকে, এই বিচারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য ক্যাম্পাসের কিছু শিক্ষক সিন্ডিকেট এবং কিছু মহল অন্যায়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক, সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক সবার ওপর বিভিন্ন আক্রমণাত্মক আচরণ করছে। এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
প্রক্টরের দিকে তেড়ে যাওয়ায় বিক্ষোভ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রক্টরের দিকে তেড়ে যাওয়া ও অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন একদল শিক্ষার্থী। তাঁরা সবাই পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের। এ ছাড়া একই ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের শিক্ষার্থীরা।
সোমবার বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে থেকে মিছিল বের করেন ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি কয়েকটি সড়ক ঘুরে শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন তাঁরা। অন্যদিকে বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের সামনে একই বিষয়ে মানববন্ধন করেন ওই হলের শিক্ষার্থীরা। দুটি কর্মসূচিতেই অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা ১২ মে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিও জানান।
পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে কয়েক দিন আগে যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, এ রকম একটা ঘটনার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো আসামি কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না, সেটার আমরা তার জবাব চাই। আবার এ বিষয়কে নিয়ে একটা ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কয়েক দিন ধরে যা করছে, আমরা তারও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সেই সঙ্গে যারা ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে, আমরা তাদের বিচার চাই।’