ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে নারীকে হত্যায় মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ওই কিশোরীর সৎবাবার

নরসিংদীতে কিশোরীকে হত্যা মামলায় সৎ বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীতে কিশোরীকে শ্বাসরোধে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেওয়া সৎবাবা আশরাফ আলী ১৫ বছর কারাগারে ছিলেন। শেরপুরে এক নারীকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যার অভিযোগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। পরে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেয়ে এক বছর আগে কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে নরসিংদীর মাধবদীতে চলে আসেন তিনি।

এবার আশরাফ আলী ধর্ষণে ব্যর্থ হয়েই ওই কিশোরীকে হত্যা করেছেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয় লোকজন। পুলিশ বলছে, লাশের সুরতহাল তৈরি করার সময় ওই কিশোরীর ঠোঁটে কাটা আঘাতের চিহ্ন ছিল, নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল। তবে তাকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা জানা যাবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর।

আরও পড়ুন

আশরাফ আলী (৪০) শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মোয়াকুড়া গ্রামের মৃত কুব্বাত আলীর ছেলে। কারাগার থেকে বের হয়েই আশরাফ আলী নরসিংদীর মাধবদীর একটি টেক্সটাইল কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন। ওই কিশোরীর মা তাঁকে মেসে খাবার খাওয়াতেন। তাঁদের মধ্যে এক পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ছয় মাস আগে ধরা পড়ে গেলে এলাকার লোকজন কাজি ডেকে তাঁদের বিয়ে পড়িয়ে দেন। এটি আশরাফ আলীর তৃতীয় ও কিশোরীর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দির মধ্যবর্তী একটি নির্জন শর্ষেখেতে ওই কিশোরীকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সৎবাবা আশরাফ আলী। পরদিন দুপুরে ঘটনাস্থলে কিশোরীটির লাশ উদ্ধারের সময় তিনি ‘ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় অপহরণের পর কিশোরীকে হত্যার’ নাটক সাজান।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আশরাফ আলী বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই কিশোরীকে নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একজন সহকর্মীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। নির্জন শর্ষেখেতের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে তারই ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন। হত্যার পর লাশ সেখানেই রেখে বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে তিনি অপহরণের নাটক সাজান।

কী বলছেন এলাকাবাসী

সম্প্রতি কিশোরীর ভাড়া বাসা, ঘটনাস্থল, লাশ উদ্ধারের স্থান ঘুরে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। কিশোরীর বাসায় প্রবেশের আগে জটলা দেখে কাছে যেতেই শোনা গেল, কিশোরীর ব্যাপারে তাঁরা কথা বলছেন। সবাই প্রতিবেশী ও কারখানার শ্রমিক। তাঁরা বলেন, ছয় মাস ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছিল ওই কিশোরী।

স্থানীয় লোকজন বলেন, এক বছর আগে ওই কিশোরীর বিয়ে হয়েছিল একজন মাদকাসক্ত যুবকের সঙ্গে। মারধরে অতিষ্ঠ হয়ে এক মাসের মাথায় সেই সংসার ছেড়ে সে মায়ের বাসায় চলে আসে। তার ঠিক পাঁচ মাস পর তার মা আশরাফ আলীকে বিয়ে করেন। এরপরই তাঁরা এক কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় তিনজন মিলে বসবাস শুরু করেন। রাতের পালায় মা কাজে চলে গেলে সৎবাবা তাকে নির্যাতন করতেন। তাই সে প্রতিরাতেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ত, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত।

কিশোরীদের বাসার বাড়িওয়ালা মতিউর রহমান বলেন, ‘লাশ উদ্ধারের পর ঘটনা জানতে পারি। আগের রাতে আমরা বাসায় ছিলাম অথচ ঘটনা কাউকে জানায়নি। ঘটনার পরপরই জানতে পারলে তো চেষ্টা করতে পারতাম। মেয়েকে তুলে নিয়ে গেল আর মা-বাবা ঘরে ঘুমাচ্ছে, এমন কথা কখনো শুনিনি।’

আরও পড়ুন

স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ১০ মিনিট হেঁটে ‘অপহরণের’ ঘটনাস্থলে যান এ প্রতিবেদক। তিন রাস্তার মোড়ে একটি ছোট মসজিদ পেরিয়ে বরইতলায় এলে সামনে যত দূর চোখ যায়, শুধু ফসলের খেত। দিনের বেলায়ও জায়গাটি নির্জন। বয়স্ক এক নারী জানান, চাষবাস করতে যাওয়া কৃষক ছাড়া এখানে খুব একটা কেউ আসেন না। ওই পথে একটু যেতেই নেমে পড়তে হলো জমিতে। জমির আল ধরে প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে পাওয়া গেল লাশ উদ্ধারের স্থান। শর্ষেখেতটির যে অংশে লাশ পাওয়া যায়, সেই অংশটি মাড়ানো। আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই।

কিশোরী হত্যায় যা জানা গেল

মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের ১০ থেকে ১২ দিন আগে আসামি হযরত আলীর বাড়িতে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর বিচার চাইতে মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যান তাঁরা। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দির মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন

কিশোরীর লাশ উদ্ধারের রাতেই ওই কিশোরীর মা ৯ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২ থেকে ৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত ৯ আসামির মধ্যে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের সবার আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলেও হত্যায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপর গত শুক্রবার কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। একপর্যায়ে তিনি পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হলে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হত্যার অভিযোগে একজন, ধর্ষণের অভিযোগে চারজন এবং অবৈধ সালিসে জড়িত থাকার দায়ে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সৎবাবা আশরাফ আলী, নূর মোহাম্মদ নূরা ও হযরত আলী আদালতে জবানবন্দি দিয়ে দায় স্বীকার করেছেন।
সৎবাবা আশরাফ আলী (৪০) ছাড়াও মামলার গ্রেপ্তার আট আসামি হলেন নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আবু তাহের নামের এক আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সহসভাপতি।

শেরপুরে যা ঘটেছিল

২০১১ সালের ৮ এপ্রিল রাতে নালিতাবাড়ী উপজেলার মৌয়াকুড়া গ্রামের ভটভটিচালক অলিল মিয়া চোখের আঘাতের চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জে বড় ভাই জলিল মিয়ার কাছে যান। এ সুযোগে জলিলের শ্যালক আশরাফ আলী রাতে সিঁধ কেটে অলিলের ঘরে ঢোকেন। তখন অলিলের স্ত্রী হাজেরা দেড় বছর বয়সী সন্তানসহ ঘুমিয়ে ছিলেন। আশরাফ আলী ঘুমন্ত হাজেরাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় হাজেরা বাধা দিলে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে হাজেরাকে ছুরিকাঘাত করেন আশরাফ আলী। পরে দরজা খুলে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যান।

এ সময় চিৎকার শুনে শ্বশুর-শাশুড়ি দ্রুত হাজেরার কাছে গিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তাঁরা ডাকাডাকি শুরু করলে ঘুম থেকে ওঠার ভান করে রক্তমাখা শরীরেই বেরিয়ে আসেন আশরাফ আলী। হাজেরাকে হাসপাতালে পাঠাতে ভটভটির সন্ধান করতে তিনি এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। এর মধ্যে রক্তাক্ত হাজেরা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ‘ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে’ মারা যান। পরে এলাকাবাসী আশরাফ আলীকে আটক করে গায়ে রক্তের দাগ সম্পর্কে জানতে চান। একপর্যায়ে আশরাফ আলী প্রকৃত ঘটনা খুলে বলেন। এ সময় তাঁকে পিটুনি দিয়ে থানায় খবর দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

এ ঘটনায় ২০১১ সালে আশরাফ আলীকে আসামি করে নিহত হাজেরার বাবা হাশেম আলী নালিতাবাড়ী থানায় মামলা করেন। আদালতে আশরাফ আলী ‘ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হাজেরাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যার’ দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৩ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শেরপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোছলেহ উদ্দিন একমাত্র আসামি আশরাফ আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। পরে উচ্চ আদালতে আপিল করে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড থেকে তিনি খালাস পান।

জানতে চাইলে নরসিংদী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সুজন চন্দ্র সরকার জানান, শেরপুরের একটি হত্যা মামলায় আট বছর আগে আশরাফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। দেড় বছর আগে উচ্চ আদালতে খালাস পেলে কারামুক্ত হন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই। তবে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। তিনি বলেন, ওই কিশোরীকে হত্যার আগে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই এ বিষয়ে বলা যাবে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দেননি।