কুমিল্লায় বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বিএনপির নেতা রেজাউলকে

থানা থেকে বের হওয়ার পর কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে জড়িয়ে ধরেন তাঁর অনুসারীরা। রোববার রাত ১২টার দিকে কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায়ছবি: প্রথম আলো

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের ১২ ঘণ্টা পর দলটির নেতাদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল রোববার মধ্যরাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার পর ঘটনাটি ঘিরে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

পুলিশ জানায়, শাসনগাছা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের ভিত্তিতে রেজাউলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

রেজাউল কাইয়ুম কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের অনুসারী হিসেবে এলাকায় তাঁর পরিচিতি রয়েছে। শাসনগাছা এলাকায় তাঁর বাড়ি হওয়ায় টার্মিনালসহ আশপাশের এলাকায় তাঁর প্রভাব আছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

গতকাল দুপুরে শাসনগাছা এলাকার বাসা থেকে রেজাউলকে আটক করেন কোতোয়ালি থানা ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা। আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে থানার সামনে অবস্থান নেন বিএনপি নেতা-কর্মী ও তাঁর সমর্থকেরা। কয়েক শ নেতা-কর্মী দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন। মধ্যরাতে ছাড়া পাওয়ার পর তাঁর অনুসারীদের আনন্দ–উচ্ছ্বাস করতে দেখা যায়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেজাউল কাইয়ুম যে বাস টার্মিনালের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, সেটি তাঁর আটকের পরই আরেকবার পরিষ্কার হওয়া গেছে। তিনি আটক হওয়ার পরপরই শাসনগাছা বাস টার্মিনালে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিবহনশ্রমিক ও তাঁর অনুসারীরা টার্মিনাল অবরোধ করলে কুমিল্লা-ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তাঁদের দাবি, টার্মিনালের ওপর রেজাউলের প্রভাব থাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন

ওই বাসিন্দারা আরও জানান, শুধু বাস টার্মিনালই নয়, শাসনগাছাসহ আশপাশের এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণ বা সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে গেলেও রেজাউলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়। কিন্তু ভয়ে কেউ এসব নিয়ে মুখ খুলতে চান না। কারণ, পুরো এলাকায় রেজাউল ও তাঁর পরিবার বেশ প্রভাবশালী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই রেজাউলকে আটক করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে শাসনগাছা বাস টার্মিনালসহ একই এলাকায় সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শাসনগাছা টার্মিনালসহ বিভিন্ন পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। তবে পরে উচ্চপর্যায় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম রায়হানসহ নেতাদের জিম্মায় রেজাউলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ছাড়ার আগে রেজাউল কাইয়ুমের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি এলাকায় চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেজাউল কাইয়ুম। তিনি বলেন, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাঁর ভাষ্য, ‘শাসনগাছায় জন্ম নেওয়াটাই যেন আমার অপরাধ। এখানে কিছু ঘটলেই দায় আমার ওপর চাপানো হয়।’

এদিকে গত শুক্রবার বুড়িচংয়ের ভরাসার বাজার এলাকায় শাসনগাছায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, প্রতিদিন তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি চাঁদা আদায় করা হয়, কিন্তু রসিদ দেওয়া হয় কম টাকার। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার দুই দিনের মাথায় রেজাউল কাইয়ুম আটক হন।