ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমাচ্ছে বগুড়া

টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি হাসপাতাল ও টিএমএসএস ক্যানসার সেন্টার ভবন। গত বুধবার বগুড়া সদর উপজেলার ঠেঙ্গামারায়ছবি: সোয়েল রানা

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য একসময় উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ রোগীকে ঢাকায় ছুটতে হতো। সেই বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলেছে। বগুড়াতেই হৃদ্‌রোগের পরীক্ষা, চিকিৎসা, পেসমেকার স্থাপন থেকে শুরু করে জটিল সব অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

হৃদ্‌রোগের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে টিএমএসএস হার্ট সেন্টার।

বগুড়া সদরের ঠেঙ্গামারা এলাকায় ২০ তলা ভবনে গড়ে ওঠা টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের একটি বিশেষায়িত ইউনিট টিএমএসএস হার্ট সেন্টার। এই হাসপাতালে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয় ২০০৫ সালে বহির্বিভাগ চালুর মাধ্যমে। এরপর দুই দশকে তা বিস্তৃত হয়েছে ক্যাথল্যাব (হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয় যেখানে), ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি (অস্ত্রোপচার ছাড়াই হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা, যেমন হৃদ্‌যন্ত্রে রিং পরানো) ও কার্ডিয়াক সার্জারির (হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচার) মতো বিশেষায়িত চিকিৎসায়। ফলে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঢাকামুখী চাপ কমেছে।

টিএমএসএস হার্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মজিবর রহমান সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫ সালে তাঁর নেতৃত্বে বহির্বিভাগ সেবা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কার্ডিওলজি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১২ সালে ১২ শয্যার সিসিইউ এবং পোস্ট সিসিইউ চালুর মাধ্যমে ইনডোর সেবা চালু হয়। আর টিএমএসএস হার্ট সেন্টার প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০২১ সালে। এ পর্যন্ত হার্ট সেন্টারে ১৭৮টি কার্ডিয়াক সার্জারি হয়েছে। এর মধ্যে বাইপাস সার্জারি, হার্টের ভাল্‌ভের অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ডিয়াক সার্জারি রয়েছে।

১৭৫ শয্যার কার্ডিওলজি বিভাগ

বর্তমানে টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে ১৭৫টি শয্যা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, হার্ট সেন্টারের বহির্বিভাগ থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৭৭ জন হৃদ্‌রোগী সেবা নিয়েছেন। আর সেন্টারে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৯৩৬ জন।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে করিয়েছেন বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি গোলাম রসুল খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে সেবার মান ঢাকার নামীদামি হাসপাতালের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। চিকিৎসার খরচও ঢাকার প্রায় অর্ধেক।

হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক অলোক চন্দ্র সরকার। গত বুধবার বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ছবি: প্রথম আলো

শুধু বগুড়া শহর নয়, আশপাশের উপজেলা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসছেন। ফলে টিএমএসএস হার্ট সেন্টার ধীরে ধীরে আঞ্চলিক হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

টিএমএসএস হেলথ সেক্টরের প্রধান ডা. মো. মতিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, একজন রোগীর জন্য এই প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক পরামর্শ থেকে শুরু করে পরীক্ষা, নিবিড় পরিচর্যা, ক্যাথল্যাবের চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে কার্ডিয়াক সার্জারির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

হৃদ্‌রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলার মানুষের প্রথম গন্তব্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রধান ভরসা বগুড়া শহরের সিলিমপুরে সরকারি এই হাসপাতাল।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি (হৃদ্‌রোগ) বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ হাজার ৯৯৪ জন হৃদ্‌রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।

হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগে সম্প্রতি চিকিৎসা নিয়েছেন জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের হাম্মাদ আলী মণ্ডল। তিনি বলেন, এখানকার চিকিৎসকেরা রোগীদের প্রতি খুবই আন্তরিক, কিন্তু শয্যা খালি পাওয়া যায় না। অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। হৃদ্‌রোগ বিভাগে শয্যার সংখ্যা বৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে।

হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিচ্ছেন টিএমএসএস হার্ট সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাহফুজুল ইসলাম। গত বুধবার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি হাসপাতালে
ছবি: প্রথম আলো

১ হাজার ৬০০ শয্যার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে অনুমোদিত শয্যা ৪৫টি। প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে দুই শতাধিক। শয্যা না পেয়ে রোগীদের অনেকে মেঝে ও বারান্দায় থেকে চিকিৎসাসেবা নেন।

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর-এ-মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে সুনাম ধরে রেখেছে। কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসকেরা বিপুলসংখ্যক রোগী সামলে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বর্তমানে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক (দুটি পদ), সহকারী রেজিস্ট্রার (দুটি পদ) এবং রেজিস্ট্রার চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে অধ্যাপকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে খালি আছে।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. অলক চন্দ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালটি আগে ৫০০ শয্যার ছিল। তখন কার্ডিওলজি বিভাগে যে জনবলকাঠামো ছিল, সেই জনবলেই এখনো চিকিৎসাসেবার কার্যক্রম চলছে। ৪৫ শয্যার কার্ডিওলজি বিভাগে রোগী ভর্তি থাকে ২০০ জনের বেশি। রোগীর অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা আরও প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি হওয়ার কথা। অন্যদিকে ১ হাজার ৬০০ শয্যার হাসপাতাল হিসাবে জনবল বাড়েনি। সীমিত জনবল দিয়ে তিন পালায় রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়।