লাল শাপলা আর পদ্মের টানে ‘বড়বিলা’য় একদিন
৪০০ একরের বেশি আয়তনের আবদ্ধ জলাশয়টিকে স্থানীয় বাসিন্দারা চেনেন ‘বড়বিলা’ নামে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত বড়বিলার মূল আকর্ষণ লাল শাপলা ও পদ্ম।
শীত মৌসুম এলেই বিস্তীর্ণ জলরাশিজুড়ে ফুটে ওঠে এই ফুল। পাশাপাশি বিলে আছে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য। বিলজুড়ে পানকৌড়ি, বক, বালিহাঁস ও সারস পাখির অবাধ ওড়াউড়ি বড়বিলার সৌন্দর্যকে করে তোলে আরও মোহনীয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কেশরগঞ্জ বাজার থেকে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের গারো বাজারগামী সড়কে রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে বড়বিলার অবস্থান। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়ক থেকে একটু হাঁটলেই বড়বিলা পর্যটনকেন্দ্রের সাইনবোর্ড। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে বিলের দুই পাড়ে ইটের রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা সহজে ঘুরে দেখতে পারেন।
আনুহাদি, হাতিলেইট, পাহাড় অনন্তপুর ও বাবুগঞ্জ—এই চার গ্রামের ঘাটে সারাক্ষণই অপেক্ষায় থাকে পর্যটকবাহী নৌকা। হাতিলেইট গ্রামের নৌকার মাঝি মো. আল আমিন বলেন, বড়বিলায় তাঁদের ৯টি নৌকা আছে। ঘণ্টাপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় নৌকায় করে বিল ঘুরিয়ে দেখানো হয়। তিনি আরও বলেন, ‘মূলত ২০১৭ সাল থেকে এই বড়বিলায় পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়। আমিই প্রথম নৌকা নামাই এখানে। প্রতিদিন হাজারখানেক পর্যটক এলেও ছুটির দিন ৪-৫ হাজার পর্যটক ঘুরতে আসেন। বিলের লাল শাপলা ও পদ্ম পর্যটকদের বেশি টানে।’
ফুলবাড়িয়ার কেশরগঞ্জ থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বড়বিলায় ঘুরতে আসেন শরিফুল ইসলাম। তিনি পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ে বায়না ধরেছে—তাকে নিয়ে বড়বিলায় ঘুরতে হবে, তাই ঘুরতে এসেছি। আমাদের এলাকায় এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর নেই।’
ময়মনসিংহ শহর থেকে বড়বিলার সৌন্দর্য দেখতে এসেছেন নেহাল আহমেদ। তিনি আরও বলেন, ‘শহরের এত কাছাকাছি প্রাকৃতিক জলাধারে লাল শাপলার সৌন্দর্য খুব টানে। তাই তিন বছর ধরে শীত এলে অন্তত একবার আসার চেষ্টা করি।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, আশ্বিন-কার্তিক মাসের শুরু থেকে শীতকালজুড়ে বিলে থাকে অসংখ্য শাপলা ও পদ্ম। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, লাল আর সবুজের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। সবুজ পাতায় ঢাকা বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর হাজারো রঙিন শাপলা বিছিয়ে থাকে। নৌকা নিয়ে ভেতরে ঢুকলেই মনে হয়, শাপলাগুলো যেন পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাতের বেলায় ফোটা শাপলা সকালবেলা রোদ উঠলে ধীরে ধীরে চুপসে যায়। তাই প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে ভোরেই বড়বিলায় আসার পরামর্শ দেন স্থানীয় লোকজন।
নৌকা ভ্রমণের সময় চোখে পড়ে জেলেদের ব্যস্ততা। ছোট-বড় নৌকায় জাল ফেলে মাছ ধরেন তাঁরা। আগে এখানে নানা জাতের ছোট-বড় মাছ পাওয়া গেলেও এখন পুঁটি, চান্দা, ট্যাংরা, বাইন, শোলসহ কিছু দেশীয় মাছ পাওয়া যায়।
স্থানীয় মৎস্যজীবী আবদুর রাজ্জাক (৬০) বলেন, বড়বিলাকে ঘিরে অন্তত চারটি মৎস্যজীবী সমিতি আছে। বিলে কচুরিপানার কারণে এখন দিন দিন মাছ কমে যাচ্ছে। আগের মতো মাছ ধরা পড়ে না। আগে বিলটি ইজারা দেওয়া থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারা বন্ধ আছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, বড়বিলায় প্রায় ৪০০ একরের ওপর খাসজমি। এক দাগে একসঙ্গে এত পরিমাণ খাসজমি বাংলাদেশের বিরল। গত অর্থবছরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি আধা পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। বিলের দুই পাড়ে কৃষ্ণচূড়াসহ পাঁচ ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে। পর্যটকদের জন্য ওয়াশ ব্লক, গোলঘর ও বেঞ্চ স্থাপনের পরিকল্পনাও আছে।