বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগের পর ডিসি ও দুই ইউএনও প্রত্যাহার, নানা প্রশ্ন

ফলাফল বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভের সময় ১২ আগস্ট বাগাতিপাড়া ইউএনওর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও সাংবাদিকদের মারধর করা হয়ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করার পর নাটোরের জেলা প্রশাসক ও দুজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রত্যাহারের ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ও লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে এবং পরদিন বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে প্রত্যাহার করা হয়।

এর আগে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গত সোমবার সন্ধ্যায় স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দেয় উপজেলা প্রশাসন। এরপর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি।

আরও পড়ুন
মঙ্গলবার লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে রাজশাহী কমিশনারের কার্যালয়ে এবং নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরদিন বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে প্রত্যাহার করে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

অভিযোগের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি বা প্রত্যাহারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটা নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ঘটনাটিকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না। তবে বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, ইউএনও কার্যালয়ের ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে বদলি বা প্রত্যাহারের কোনো সম্পর্ক নেই।

সদ্য বিদায়ী লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহ ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাক বদলি বা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিদায়ী জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি করি। বদলির আদেশ আমাদের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে অন্য কিছুর সম্পর্ক দেখি না।’

বাগাতিপাড়ার ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা। ১২ আগস্ট দুপুরে উপজেলা পরিষদে ইউএনও কার্যালয়ের সামনে
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১২ আগস্ট দুপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল বাতিলের দাবিতে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এর জেরে হামলা, ভাঙচুর ও কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই উপজেলার ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাদী হয়ে ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় (সোমবার) সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। এতে বাগাতিপাড়ায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর লালপুরে ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৬০ থেকে ৭০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এ ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে রাজশাহী কমিশনারের কার্যালয়ে এবং নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরদিন বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে প্রত্যাহার করে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া মঙ্গলবার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশীদকেও প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

আরও পড়ুন

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নাটোরের সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন,একটি দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মিছিল করে ফলাফল বাতিলের দাবি জানান। অভিযোগ আছে, তাঁরা ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অভিযোগ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক নয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আর সাহস না-ও পেতে পারেন।

আমরা সরকারি চাকরি করি। বদলির আদেশ আমাদের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে অন্য কিছুর সম্পর্ক দেখি না।
আসমা শাহীন, বিদায়ী জেলা প্রশাসক

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যেতেই পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে দলীয় পদপদবি উল্লেখ করে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করার মধ্যে ষড়যন্ত্র আছে বলে তাঁরা মনে করেন। এর সঙ্গে কর্মকর্তাদের বদলির কোনো সম্পর্ক নেই বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

তিন দিনেও মামলা রেকর্ড হয়নি

হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে লালপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা ও বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা শুকুর আলী বাদী হয়ে সোমবার সন্ধ্যায় দুই থানায় পৃথক অভিযোগ জমা দেন। কিন্তু তিন দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি।

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের দাবিতে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে ছাত্রদল ও যুবদলের বিক্ষোভ
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

লালপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা থানায় অভিযোগ দিয়ে আসছি। এখন যা করার পুলিশ করবে। আমরা অপেক্ষা করছি।’ একই কথা বলেন বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা শুকুর আলী।

আরও পড়ুন

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও মামলা রেকর্ড না করার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বাগাতিপাড়া থানার উপপরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে অফিশিয়ালি তাঁকে কেউ জানাননি। তিনিও এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেননি। নতুন কোনো তথ্য জানতে পারলে তিনি জানাবেন বলে জানান।