সুন্দরবনে টহলের নতুন কৌশলে উদ্ধার হচ্ছে শিকারিদের পাতা ফাঁদ, রক্ষা পাচ্ছে প্রাণী
সুন্দরবনের পূর্ব অংশে ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ হাজার ৬৪৮ ফুট ‘মালা ফাঁদ’ উদ্ধার করে বন বিভাগ। একই সময়ে শিকার করা হরিণের মাংস জব্দ হয় ৭৯৩ কেজি। এর পরের এক বছরে বনে পেতে রাখা ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট ফাঁদ উদ্ধার করেছেন বন বিভাগের কর্মীরা। এই সময়ে হরিণের মাংস জব্দের ঘটনা কমে ২৫০ কেজি হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গহিন সুন্দরবনে নিয়মিত টহল-ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাফল্য এসেছে। এতে কেবল হরিণ শিকারই কমেনি, রক্ষা পাচ্ছে বাঘসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী। আগে মূলত খালে বা খালের পাড়ে জলযানে করে টহল দিতেন বনকর্মীরা। বর্তমানে বনের ভেতর ‘প্যারালাল লাইন সার্চিং’ বা সুশৃঙ্খলভাবে পাশাপাশি হেঁটে দলবদ্ধ টহল বৃদ্ধি করায় অনেক ফাঁদ উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে সুন্দরবনেও। নতুন করে মাথাচাড়া দেয় দস্যুতা। বাড়তে থাকে অবৈধ প্রবেশ, বন্য প্রাণী শিকার, মাছ-কাঁকড়া আহরণ করতে অভয়ারণ্যে ঢুকে পড়া, বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধ। এমন বাস্তবতায় বন্য প্রাণী শিকারসহ বন অপরাধ দমনে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ নতুন কৌশলে টহল জোরদার করে। একই কৌশলে টহল দিচ্ছেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের কর্মীরাও।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুন্দরবন রক্ষায় আমরার সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, বন বিভাগের তৎপরতা বেড়েছে, এটা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে বিষ দিয়ে মাছ শিকারসহ বিভিন্ন বন অপরাধীদের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক আছে। এর সঙ্গে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অনেকে জড়িত। তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
টহল বেড়েছে, ফাঁদও উদ্ধার হচ্ছে বেশি
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ মূলত ‘পূর্ব ও পশ্চিম’—এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
পূর্ব বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে বন বিভাগের অভিযানে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট হরিণ শিকারের প্রাণঘাতী ‘মালা ফাঁদ’ উদ্ধার ও অপসারণ করা হয়েছে। একই সময়ে ৮১৩টি সিটকা ফাঁদ ও ২ হাজার ২৯৪টি হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ফাঁদ থেকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে বাঘ, হরিণ, শূকর, বানরসহ অন্তত ১৫টি প্রাণী। ফাঁদ পাতার অভিযোগে গত এক বছরে ৭০ জন হরিণশিকারিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
বন বিভাগ বলছে, ঝুঁকি থাকলেও দুর্গম বনে কৌশলগত এই পরিবর্তনের ফলে কেবল হরিণ শিকারই কমেনি, রক্ষা পাচ্ছে বাঘসহ বহু বন্য প্রাণী। ফাঁদে আটকা প্রাণীগুলোকে উদ্ধারের পর শুশ্রূষা দিয়ে ফের সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ফাঁদে আটকে আহত একটি বাঘিনীকে উদ্ধারের পর সুস্থ করে ১৩ জুলাই আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আগে বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে একসঙ্গে ৫০০-৬০০ কেজি পর্যন্ত হরিণের মাংস জব্দ হতো। এখন সেই ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার হওয়ার আগেই তাঁরা ফাঁদ অপসারণ করতে পারছেন।
যে পদ্ধতিতে চলে টহল
‘প্যারালাল লাইন সার্চিং’ টহলের ক্ষেত্রে বনকর্মীরা বনের ভেতর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে লাইন করে হেঁটে চলেন। যদিও দুর্গম সুন্দরবনের সব এলাকায় এটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সাপ, বাঘ-কুমিরের আক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানিয়েছেন বনকর্মীরা।
সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তানভির হাসান নিয়মিত এ ধরনের টহলে নেতৃত্ব দেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য মৌয়ালরা যেভাবে হেঁটে হেঁটে মৌচাকের খোঁজ করেন, এখন অনেকটা সেভাবেই চলে টহল ও সার্চিং। একটু আগে-পরে হলেও দলে থাকা ছয় থেকে সাতজন পাশাপাশি হেঁটে চলেন; অনেকটা চিরুনির মতো করে। তিনি আরও বলেন, ‘বনের মধ্যে অসংখ্য নদী-খাল। আর প্রতিটি স্টেশনেই কিছু হটস্পট আছে, যেখানে ফাঁদ পাতা হয় বেশি বা অপরাধপ্রবণ। যেমন আমার এখানে জামতলাসহ কিছু এলাকা আছে, সেখানে এভাবে টহল বেশি করা হয়।’
এই টহল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে অ্যাপ। যেখানে প্রতিদিন কোন স্টেশনের টহল দল কোথায় কতটুকু হেঁটে টহল দিল, তা জিপিএসের সহায়তায় মনিটর করা হয়। পূর্ব সুন্দরবনে ৪৩টি ফরেস্ট স্টেশন ও ক্যাম্প আছে। প্রতিটি ইউনিট তাঁদের আওতাধীন বনাঞ্চলে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি একদিন পরপর ফাঁদ অনুসন্ধান করেন। পাশাপাশি স্মার্ট প্যাট্রোলিং (প্রতি রেঞ্জে মাসে এক বার আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে স্পিডবোটে টানা সপ্তাহব্যাপী টহল) ও ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বনকর্মী যারা সুন্দরবনে কাজ করছে, তাদের আমরা হেঁটে টহলে উদ্বুদ্ধ করেছি। এর সুফল কিন্তু আমরা দেখছি। হাজার হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদ আমরা সুন্দরবন থেকে উদ্ধার করতে পারছি।’
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নিয়মিতভাবে প্যারালাল লাইন সার্চিং পদ্ধতিতে টহল দিচ্ছেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের কর্মীরাও। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জোয়ারের সময় নদী-খালপথে নৌযানে টহল পরিচালনা করা হলেও ভাটার সময় বনরক্ষীরা বনের ভেতরে হেঁটে চিরুনি অভিযানের মতো করে এলাকা তল্লাশি করেন। এ পদ্ধতিতে দ্রুত শিকারিদের পাতা ফাঁদ শনাক্ত ও অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেক হরিণের প্রাণ রক্ষা করা যাচ্ছে।
ফাঁদে আটকা প্রাণীরা ছুটতে পারে না
বন বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘মালা ফাঁদ’ পাতা হয় চিকন দড়ি বা রশি দিয়ে। কখনো ব্যবহার হয় জিআই তার বা গুনা। গাছের গোড়ার দিকে একটার পর একটা বৃত্ত আকারে মালার মতো এই ফাঁদ পাতা হয়। এতে দৌড়ে যাওয়া হরিণ না বুঝে আটকে পড়ে। হরিণ, শূকর, বানর, এমনকি বাঘও এসব ফাঁদে আটকে থাকা অবস্থায় সাম্প্রতিক সময় উদ্ধার হয়েছে। এই ফাঁদে আটকা পড়লে যেকোনো প্রাণীই আর ছুটতে পারে না।
৩ জুলাই পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন সত্যপীর খাল এলাকায় টহলের সময় বনরক্ষীরা শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে থাকা একটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করেন। একই স্থান থেকে আরও ১২টি ফাঁদ জব্দ করা হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও হাছানুর রহমান বলেন, টহলের সময় বিভিন্ন স্থানে ফাঁদে জীবিত হরিণ আটকে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও ফাঁদে মারা যাওয়া হরিণের মরদেহ পাওয়া গেছে। আবার কোথাও ফাঁদে আটকে পড়া হরিণকে বাঘে খাওয়ার আলামতও মিলেছে।
২০১২ সালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে তিন পায়ের একটি বাঘ দেখা গিয়েছিল। সেই ঘটনা উল্লেখ করে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘের শক্তি বেশি, এটি ফাঁদ থেকে নিজে ছাড়াতে যত বেশি চেষ্টা করে, ততই নাইলনের রশি মাংসপেশি কেটে ভেতরে ঢুকে যায়। ২০১২ সালে দেখা যাওয়া তিন পায়ের বাঘটির একটি পা সম্ভবত হরিণ ধরার ফাঁদেই কাটা পড়েছিল।
১৫০ শিকারির তালিকা প্রস্তুত
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ বলছে, বনকেন্দ্রিক অপরাধের ঘটনায় গত এক বছরে ৪৭৪টি অভিযান চালানো হয়। ২৪১টি মামলায় ৩৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩৯৬ জনের বিরুদ্ধে বন মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বন অপরাধ কমাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, হরিণশিকারিদের হটস্পট বলে খ্যাত সুন্দরবনসংলগ্ন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জ্ঞানপাড়া ও চরদুয়ানিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে দুটি ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পূর্ব সুন্দরবনের প্রায় ১৫০ জন চিহ্নিত শিকারির তালিকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন কেবল বাঘের জন্য নয়, মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য জরুরি বলেন মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ। তিনি বলেন, এই বনকে রক্ষা করতে হলে বাঘ ও হরিণ—এ দুটি প্রাণীকে রক্ষা করতে হবে।
অপরাধ দমনে বন বিভাগের সক্ষমতার ঘাটতি দূর করার ওপর জোর দিয়ে বন্য প্রাণী-বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ আরও বলেন, সুন্দরবনের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ জন্য বনের দস্যু নির্মূল, বিষ দিয়ে শিকার এবং যেসব ফাঁদ দিয়ে বন্য প্রাণী ধরা হচ্ছে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ইমতিয়াজ উদ্দীন, সাতক্ষীরা]