দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আসলে কোনটি
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করতে সরকারি উদ্যোগে নতুন জরিপ শুরু হয়েছে। একসময় কেওক্রাডং এবং পরে তাজিংডংকে সর্বোচ্চ ধরা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অভিযাত্রীদের তথ্য অনুযায়ী সাকাহাফং শীর্ষে রয়েছে বলে দাবি উঠেছে। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে আধুনিক জিএনএসএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ অধিদপ্তর নতুন করে পরিমাপ করছে, যার ফলাফল শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।
দীর্ঘ বহু বছর সরকারি নথি অনুযায়ী বান্দরবানের কেওক্রাডাং ছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। চলতি শতকের শুরুতে সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে তাজিংডং পাহাড়ের নাম উঠে আসে। তবে জিপিএস প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এই দাবি নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বান্দরবানের পাহাড়ে শৌখিন পর্যটকদের অনেকে দাবি করেন, দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সাকাহাফং। এই বিভ্রান্তি দূর করতে দেশের জরিপ অধিদপ্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উঁচু পাহাড়ে জরিপ কাজ শুরু করেছে।
বান্দরবানের কেওক্রাডং, সাকাহাফং ১-২, জৌতলাং, যোগিহাফং, আইত্লাং, তহজিংডং ও রাঙামাটির দুমলং ও রাইংক্ষ্যং পাহাড়ে জরিপকাজ চালাচ্ছে জরিপ অধিদপ্তর। পাঁচ বছর পর এমন জরিপ হচ্ছে সরকারিভাবে। এর মধ্যে বান্দরবানের পাহাড়গুলোর উচ্চতা পরিমাপের মাঠ জরিপের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এরপর রাঙামাটির দুটি পাহাড়ের কাজ শেষ হলে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আগামী মাসের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় শৃঙ্গ বা শীর্ষবিন্দু কোনটি, তা ঘোষণা করা হবে।
বান্দরবান সার্কিট হাউসে গত শুক্রবার রাতে জরিপ অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুর-এ-আলম মোহাম্মদ যোবায়ের সরোয়ার এই তথ্য জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ পাহাড় শৃঙ্গ নির্ণয়ের জরিপসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে জানানোর জন্য তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষা সার্ভে পরিচালক আব্দুর রউফ হাওলাদার, উপপরিচালক মেজর তৌহিদুল হক, মাঠ জরিপ দলের প্রধান দেবাশীষ সরকার ও জরিপ কর্মকর্তা বশির উদ্দিন।
জরিপ কাজে ২৭ জনের একটি দল চারটি উপদলে ভাগ হয়ে মাঠে নেমেছে। ২০২২ সালের একবার সর্বোচ্চ পাহাড় নির্ণয়ের জরিপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরে ৩৫ জনের একটি জরিপ দল থানচিতে কয়েকটি পাহাড় জরিপ করেছিল। কিন্তু ওই সময়ে রুমা ও থানচির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অশান্ত থাকায় জরিপ দলটি কাজ শেষ না করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
সার্ভেয়ার জেনারেল যোবায়ের সরোয়ার বলেন, দেশের সব কটি উঁচু পাহাড় পার্বত্য চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সর্বোচ্চ পাহাড় বান্দরবানে ও ২০ শতাংশ রাঙামাটিতে। গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ের জরিপকাজ চলছে। ৪ এপ্রিল জরিপ শুরু হয়। ইতিমধ্যে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় তাজিংডং, সাকাহাফং, জৌত্লাং পাহাড়ে মাঠ জরিপ শেষ হয়েছে। গতকাল শনিবার কেওক্রাডং পাহাড়ের জরিপ শেষ হয়। রাঙামাটির দুমলং ও রাইংক্ষ্যং পাহাড়ের জরিপ শেষ হলে মাঠের কাজ শেষ হবে। এই জরিপে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় শৃঙ্গ নির্ণয় হবে। একই সঙ্গে পাহাড়গুলোর খাড়ার মাত্রা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা যাবে। কোনো পাহাড়ের উচ্চতা ও নির্ভুল দূরত্ব জানা গেলে পর্যটকের আগমন বাড়বে।
জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরিপকাজে ২৭ জনের একটি দল চারটি উপদলে ভাগ হয়ে মাঠে নেমেছে। ২০২২ সালের একবার সর্বোচ্চ পাহাড় নির্ণয়ের জরিপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরে ৩৫ জনের একটি জরিপ দল থানচিতে কয়েকটি পাহাড় জরিপ করেছিলেন। কিন্তু ওই সময়ে রুমা ও থানচির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অশান্ত থাকায় জরিপ দলটি কাজ শেষ না করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
‘দেশের সব কটি উঁচু পাহাড় পার্বত্য চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সর্বোচ্চ পাহাড় বান্দরবানে ও ২০ শতাংশ রাঙামাটিতে। গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ের জরিপ কাজ চলছে। ৪ এপ্রিল জরিপ শুরু হয়। ইতিমধ্যে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় তাজিংডং, সাকাহাফং, জৌত্লাং পাহাড়ে মাঠ জরিপ শেষ হয়েছে।’
বান্দরবানের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় নিয়ে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলছে। একসময়ে সরকারিভাবে প্রথমে কেওক্রাডং, তাজিংডংকে সর্বোচ্চ পাহাড় বলা হতো। কিন্তু পর্যটকদের তথ্যে অনেকে দাবি করেন, সাকাহাফং পাহাড় তাজিংডংয়ের চেয়ে উঁচু। এই বিতর্ক দূর করতে জেলা প্রশাসন থেকে ২০২২ সালে ২৩ মে পাহাড়গুলোর উচ্চতা পরিমাপের জন্য সার্ভেয়ার জেনারেলের কাছে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। দ্রুত সাড়া দিয়ে জরিপ দল এলেও পরিস্থিতির কারণে শেষ করতে পারেনি। সেই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য এবারে জরিপ দল এসেছে।
উল্লেখ্য, বান্দরবানে বেড়াতে যাওয়া অনেক পর্যটক নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন চূড়ার উচ্চতা মেপেছেন। এর মধ্যে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের দেওয়া তথ্য অনুসারে সবচেয়ে উঁচু পর্বত শৃঙ্গ হলো সাকাহাফং। জেলার থানচি উপজেলায় অবস্থিত সাকাহাফং-এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৫২ মিটার (৩ হাজার ৪৫১ ফুট)।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানের রুমা উপজেলার তাজিংডংকে দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। বিভিন্ন সরকারি নথি ও পুরোনো জরিপের তথ্য অনুযায়ী এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৩৩ মিটার (৩ হাজার ৩৮৯ ফুট)। এখনো অনেক পাঠ্যবই ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যে এই শৃঙ্গকে সর্বোচ্চ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে পর্যটকদের কাছে পরিচিত কেওক্রাডং একসময় দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। তবে পরবর্তী জরিপে এর উচ্চতা প্রায় ৯৮৬ মিটার (৩ হাজার ২৩৫ ফুট) নির্ধারিত হওয়ায় এটি এখন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে উচ্চতা নির্ধারণে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, সেখান থেকেই বিভ্রান্তির সূত্রপাত।