মেহেন্দীগঞ্জে ঈদুল আজহার আগের দিন ঝড়ের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড বাড়িঘর
ঈদুল আজহার আগের দিন কালবৈশাখীর ভয়াবহ তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা। আজ বুধবার সকালে আকস্মিক ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছ। ভেঙে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি, ছিঁড়ে গেছে বিদ্যুতের তার। এতে সকাল থেকেই পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
উপজেলাটি মেঘনাবেষ্টিত ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হওয়ায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে।
স্থানীয় প্রশাসন জানায়, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার দুর্গম ইউনিয়ন মেঘনা, কালাবদর, গজারিয়া, তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে অনেক সময় লাগবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চর এককরিয়া, আলিমাবাদ, রায়পুরা,আন্ধারমানিক, ভাসানচর ইউনিয়ন, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে গাছপালা ও ঘরদোরের বেশ ক্ষতি হয়েছে। চর এককরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মকিম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ব্যাপক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ঘরবাড়ির ক্ষতির খবরও আসছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।’
এদিকে ঝড়ের তাণ্ডবে বিভিন্ন সড়কে গাছ পড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখি মানুষ ও সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেক এলাকায় মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট–সেবা বিঘ্নিত হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, আজ সকালেই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করে। সকাল ৯টার দিকে প্রবল বেগে ঝড় শুরু হয়। তীব্র বাতাসে মুহূর্তেই বিভিন্ন এলাকার টিনের ঘর উড়ে যায়, গাছ ভেঙে পড়ে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে।
প্রবল ঝড়ে মেহেন্দীগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর চুনারচর গ্রামের বাসিন্দা হানিফ পোদ্দারের বাড়ির ওপর আছড়ে পড়ে একটি বিশাল চাম্পল গাছ। এতে ঘরের বারান্দা দুমড়েমুচড়ে যায়। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান ঘরে থাকা তিন সদস্য। হানিফ পোদ্দারের স্ত্রী বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে আমরা ভয় পেয়ে যাই। পরে দেখি বিশাল গাছটা ঘরের ওপর পড়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে হয়তো আমরা বাঁচতাম না। আল্লাহর রহমতে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি।’
ঝড়ে চরগোপালপুর ইউনিয়নের মিটুয়া খেয়াঘাট এলাকায় অবস্থিত বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে দোকানের টিন উড়ে গেছে। গাছ ভেঙে দোকানচাপা পড়া এবং কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া গেছে। তবে উপজেলাটি মেঘনা নদীর বিভিন্ন চরবেষ্টিত ও সড়ক যোগযোগ না থাকায় দুর্গম এসব চরের বাসিন্দাদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায়। ঝড়ে গাছ পড়ে একাধিক স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে এবং বহু খুঁটি উপড়ে পড়েছে। ফলে সকাল থেকে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হওয়ায় দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় লাইন মেরামতের কাজ শুরু করা গেলেও ভাঙা খুঁটি, ছেঁড়া তার ও গাছ অপসারণে সময় লাগবে। ঈদের আগে বিদ্যুৎ পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। একই সঙ্গে ঈদের কোরবানির মাংস সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের খোঁজখবর নিচ্ছি। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেতে আরও সময় লাগবে। তালিকা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিয়াজুর রহমান বলেন, ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকেদের তালিকা করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে।
এদিকে ঝড়ের পর থেকেই পুরো উপজেলায় একধরনের আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ঈদের আনন্দের বদলে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার, গরম ও দুর্ভোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।