শকুন্তলা প্রথম বাংলাদেশে দেশীয় ছোট মাছের পুষ্টির গুণমান নিয়ে পরীক্ষা করেন। তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয়, কম মূল্যের এবং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এই মলায় উচ্চ মাত্রার একাধিক প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি ও ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। যা শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশের জন্য অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তিনি গবেষণায় দেখান, শিশুদের জীবনের প্রথম এক হাজার দিন বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শিশু ও মায়েদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য জীবন গঠনকারী সব খাদ্যমান নিশ্চিত করতে পারে মলা মাছ।

এটাই ছিল বাংলাদেশে প্রথম দেশীয় ছোট মাছের প্রজাতির পুষ্টিগুণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই গবেষণায় প্রমাণিত হয় সাশ্রয়ী ও স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য মলা মাছে উচ্চ মাত্রার একাধিক প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট) এবং ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে।

default-image

মূলত ছোট মাছ অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ, এ ধারণার উদ্ভাবক শকুন্তলা। আর তা প্রমাণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল ওহাব ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী। শকুন্তলা ও আবদুল ওহাব দুজন ১৫ বছর ধরে মলা ও ছোট মাছ নিয়ে নিরলস এই গবেষণা করেন। তাঁরা বের করেছেন, কীভাবে এই পুষ্টিসমৃদ্ধ ছোট মাছ স্থানীয়ভাবে সস্তায় লালনপালন করা যায়৷ বড় মাছের সঙ্গে একই পুকুরে চাষ করা যায়।

গবেষণায় তাঁরা লক্ষ করেন, মাছ চাষের জন্য রাক্ষুসী মাছ নিধন করতে পুকুরে কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। চাষ করা মাছের সঙ্গে যাতে খাদ্য ও আবাস নিয়ে প্রতিযোগিতা না হয়, সে জন্য মৎস্যচাষিরা কীটনাশক দিয়ে পুকুর পরিষ্কার করতেন। কিন্তু নতুন প্রযুক্তি দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেন, ছোট মাছ স্থান বা খাবারের জন্য বড় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না। এর পরিবর্তে কার্প ও মলা মাছ এই চাষপদ্ধতিতে বড় মাছের সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে এবং এতে মোট উত্পাদন কমে না, বরং বেড়ে যায়। কারণ, ছোট মাছ প্রতি সপ্তাহে আংশিক আহরণ করা যায়। এ নিয়ে তাঁরা জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নেন এবং এতে সফলতাও এসেছে। দেশে এখন মলা মাছের চাষ হচ্ছে। হ্যাচারিতে মলার রেণু উৎপাদন করা হচ্ছে। এরপর এই প্রযুক্তি ও ধারণা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, জাম্বিয়া, মালাউইসহ অনেক দেশে ছড়িয়ে দেন। এসব দেশে নিয়মিত মলা মাছ (তাজা ও শুকনা) এবং এর চাটনি থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবার বাচ্চাদের ও বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করছে, যা শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনের সুরক্ষা করছে।
প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে দিয়ে বসতবাড়ির পুকুরে মলা চাষ ও ব্যবহার সহজলভ্য করতে মলা ধরার জন্য মশারিজাতীয় সস্তা, ঘরে তৈরি জাল উদ্ভাবন করা হয়েছিল। ‘গিলনেট’ নামের ওই জাল দিয়ে নারীরা সহজেই দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অল্প পরিমাণে মলা মাছ ধরে পরিবারের খাবারের জোগান দিতে পারেন।

ওয়ার্ল্ড ফিশ ২০১২ সালে বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলায় মলা মাছের চাষ সম্প্রসারণে কাজ শুরু করে। ২০১৫ সাল থেকে এ অঞ্চলে মলা মাছ খাওয়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বরিশাল-ঝালকাঠির ১৮টি গ্রামকে পুষ্টি গ্রাম ঘোষণা করে সংস্থাটির মলা মাছ জনপ্রিয় করতে কাজ করে। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি শেষ হলেও এখনো এসব গ্রামের অনেক পরিবার পুকুরে মলা মাছের চাষ, সংরক্ষণ অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, বগুড়া, ময়মনসিংহে মলার ব্যাপক চাষ হচ্ছে। রুই, পাঙাশ, তেলাপিয়া মাছের সঙ্গে মিশ্রপদ্ধিতে মলা মাছ চাষ হচ্ছে। দিন দিন মিশ্র চাষ বাড়ছে।

মলার পুষ্টিগুণের ওপরে প্রথম পিএইচডি করেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এইচ এম কোহিনুর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মলা এতই পুষ্টিমানসমৃদ্ধ মাছ যে প্রতিদিন একটি বা দুটি মলা মাছ খেলে কারও বাড়তি ভিটামিন নেওয়ার দরকার নেই।

default-image

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামের গৃহিণী সান্ত্বনা রানী, শিখা রানী ও রওশন আরা বেগম মঙ্গলবার বলেন, প্রকল্প শেষ হলেও এখনো তাঁরা পুকুরে মলা মাছ সংরক্ষণ করছেন এবং রান্না করে পরিবারের পাতে তুলে দিচ্ছেন।

আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, ‘মলাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে শকুন্তলার বিশ্বস্বীকৃতি এবং দেশে মলা মাছের রেণু উৎপাদন করে জাতীয়ভাবে নুরুল হকের স্বীকৃতি আমাদের দীর্ঘ পরিশ্রমের সফলতাকে আনন্দময় করেছে। আমরা এখন নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মলা মাছকে ওজনে-আকৃতিতে বৃদ্ধি করে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেব। এই স্বীকৃতি আমাদের সেই কাজকে উদ্বুদ্ধ করবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন