ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দেওগাঁও গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম
ছবি: প্রথম আলো

মাথার ওপর ভাদ্রের তপ্ত সূর্য। বইছে গরম হাওয়া। এমন এক দুপুরে সবজিখেতে নিড়ানিতে ব্যস্ত কৃষক। রোদের তাপ থেকে রক্ষা পেতে মাথা ঢেকে রেখেছেন গামছায়। কেমন আছেন? প্রশ্নটি শুনে মুখ তুলে তাকালেন তিনি। মুখে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম গামছায় মুছে বললেন, ‘হামার দিন কঠিন হয়া গেইছে।’

এই কৃষকের নাম রফিকুল ইসলাম (৫৫)। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দেওগাঁও গ্রামে। গতকাল রোববার দুপুরে তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। সে সময় তিনি তাঁর জীবনসংসারের কথা বলেন।

স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে রফিকুলের পরিবার। ছেলেটি প্রতিবন্ধী। আর মেয়েটির বয়স দুই বছর। চার বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ করে চলে তাঁর সংসার।

রফিকুল বলেন, ‘আগেতে সয়াবিন তেলের কেজি ছিল ৮০ টাকা, অ্যালা সেই তেলের দাম হছে ১৮০ টাকা। আটার কেজি ছিল ৩০ টাকা, অ্যালা বিক্রি হছে ৬০ টাকায়। চিনির দাম ৭০ থাকিয়া ৮০ টাকা বাড়িছে। কয়েক মাস আগতেও সোনালি মুরগি ছিল ১৬০ টাকা আর অ্যালা বেড়ে হইছে ৩০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দাম ১৩০ টাকা থাকিয়া ১৯০ টাকা হয়া গেইল। বাজারের সব জিনিসের দাম অ্যালা দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়ে গেইছে। হামরা খেতের ধানের চাল আর সবজি পাও বলিয়া সংসার চলে যাছে।’

আরও পড়ুন

খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ বছরে সর্বোচ্চ, মানুষের কষ্ট আরও বাড়ল  

এই আয় দিয়ে কেমন সংসার চলছে, তা জানতে চাইলে মুখটা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো চুপসে যায় কৃষক রফিকুলের। তিনি বললেন, ‘চলে নাকি, চালায় নিবা হচে। কোরবানি ঈদের পরে গরুর মাংস কিনিবা পারুনি। যেই খরচ (পণ্য) এক কেজি লাগে, তা আধা কেজি দিয়ে চালাবা হছে।’ সংসারের বাড়তি খরচ কমিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বললেন, ‘অ্যালা দাওয়াতবাড়ি যাওয়া ছাড়ে দিছু।’

গত বোরো মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে ধান আবাদ করে ৩০ হাজার টাকা মুনাফা করেছিলেন রফিকুল। কিন্তু এবারের আমন মৌসুমে তাঁর কপালে লোকসানের ভাঁজ পড়েছে। তিনি জানালেন, বৃষ্টি নেই। যন্ত্র ভাড়া করে সেচ দিতে হচ্ছে। আর এতেই কৃষিপণ্যের খরচের পাশাপাশি সেচের খরচও বেড়ে গেছে। সবজির দাম ভালো পেলেও মূল লাভটা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে।

এখন দিন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না রফিকুলের। হাতের সব পুঁজি কৃষিতে লগ্নি করেছেন। রফিকুল জানালেন, এখন কায়দা করে চালাতে হচ্ছে তাঁর সংসার। কায়দাটা কেমন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে মাংস খেতেন। এখন ডাল আর সবজি দিয়ে সেটা চালিয়ে নিচ্ছেন। ছেলে-মেয়ে আবদার করলে ফসল ওঠার সময় চেয়ে নিচ্ছেন তিনি।

ফেরার পথে রফিকুল বললেন, ‘দিন এমন থাকিবে না। জমির ধান আর সবজি উঠিলেই দিন ফিরিবে।’