প্রথমবারের মতো তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে আসায় বিচারে আশা দেখছে পরিবার

নিহত সোহাগী জাহান তনুফাইল ছবি

দীর্ঘ এক দশক পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান ওরফে তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন সাবেক তিন সেনাসদস্যের নাম প্রকাশ্যে এসেছে।

তনু হত্যার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম বলে আসছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু কখনো নামগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রকাশ্যে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তিনজনের নাম প্রকাশ্যে আসায় বিচারে ‘আশার আলো’ দেখছেন পরিবারসহ সচেতন নাগরিকেরা।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুমিল্লায় আসেন। এ সময় তিনি মামলার অগ্রগতি জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন করেন। আদালত তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সন্দেহভাজন ওই তিনজন হলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহীন আলম। তাঁরা বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন। তবে তনু হত্যার পর কখন তাঁরা অবসরে গেছেন বা তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মামলার বাদী ও তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ হবে। তাঁরা ঘটনার শুরু থেকেই নামগুলোর কথা বলে আসছেন। শাহীন নামে কোনো সৈনিকের কথা তাঁরা তখন জানেননি, সৈনিক জাহিদের নামটি বারবার আলোচনায় এসেছে।

কী হয়েছিল সেদিন

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। পরদিন তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।

হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে তখন তাঁদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি।

তদন্ত করেছেন ছয়জন কর্মকর্তা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার শুরুতে থানা-পুলিশ, পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইকে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। কিন্তু তিনিও কোনো অগ্রগতি আনতে পারেননি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।

এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তার মধ্যে পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান ও ২০১৬ সালে সিআইডির কুমিল্লার তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ সবচেয়ে বেশি সময় মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁরা চার বছর করে আট বছর মামলাটির তদন্ত করেছেন। জালাল উদ্দিন আহম্মদের মুঠোফোনে কল দিলেও সাড়া না দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে পরিদর্শক মজিবুর রহমান বর্তমানে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশে কর্মরত। মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। প্রকাশ্যে আসা তিনজনের বিষয়ে জানতেন কি না, প্রশ্ন করলে মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরাও বিষয়টি জানতাম। আমরা চেষ্টা করেছিলাম ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয়নি। এর বাইরে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে পারব না। আপনি বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।’

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম গতকাল আদালতে মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানান। তিনি তিনজনের নাম উল্লেখ করে ডিএনএ ম্যাচিংয়ের আবেদন করে আদালতকে বলেন, ‘২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে পাওয়া তিনজন পুরুষের শুক্রাণু থেকে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরে সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে ওই তিনজনের ডিএনএ ম্যাচিং করা হয়নি।’ এরপর আদালত ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ে সম্মতি জানান।

যোগাযোগ করলে তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। আপাতত আমরা এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, তদন্তের মাধ্যমে সব বেরিয়ে আসবে।’

কী বলছে তনুর পরিবার

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার মাইয়াডার ওপর নির্মম পাশবিক নির্যাতন কইরা খুন করা হয়েছে। আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ছি না। সব সময় আল্লাহর কাছে কইছি, আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে আমারে বিচারডা দেখায়। সার্জেন্ট জাহিদ বড় খুনি। তারে গ্রেপ্তার করনের লাইগ্যা কতবার কইছি; কিন্তু কেউ আমরার কথা শুনছে না। অবশেষে তার নামডা আদালতে গেছে। এহন আমরা বিচার দেখতাম চাই। এই জীবনে আর কিছু চাই না। শুধু মাইয়াডার খুনিডির বিচার দেখতাম চাই। আইন আর বিচার যদি সবার লাইগ্যা সমান হয়, তাইলে আমার তনুর খুনের বিচারও পাইয়াম—এই আশায় দিন কাটাইতাছি।’

তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, সিআইডি যখন মামলাটির তদন্ত করেছে, তখন সন্দেহভাজন কয়েকজনকে ঢাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে কখনো তাঁদের নাম প্রকাশ্যে আসেনি। এবারই প্রথম তিনজনের নাম প্রকাশ্যে এল। এ উদ্যোগে কিছুটা আশার আলো দেখছেন উল্লেখ করে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা অপরাধীদের বিচার চাই, কোনো বাহিনীর না। অদৃশ্য চাপে যেন মামলাটি আবার অন্ধকারে না চলে যায়।’

আরও পড়ুন

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক জাহিদই নয়; এর বাইরে আরও অনেকে আমার মেয়ের হত্যার সঙ্গে জড়িত। ঘটনার সময় তনুর চুল কাটা হয়েছিল। সেটিও করেছেন একজনের স্ত্রী। সার্জেন্ট জাহিদ আর তাঁর স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া আরও অনেকে এই খুনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। আমার বয়স হয়ে গেছে। মৃত্যুর আগে খুনিদের বিচার দেখে যেতে চাই।’

আশা দেখছে সচেতন মহল

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি কাইমুল হক বলেন, ‘এই উদ্যোগ ২০১৭ সালেই নেওয়ার কথা। কিন্তু দেরিতে হলেও জড়িত সন্দেহে তিনজনের নাম সামনে এসেছে। আমি আশাবাদী এই খুনের বিচার নিয়ে। আইন সবার জন্য সমান। তনুর পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, আমরা তাঁদের পাশে থাকব।’

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তনুর পরিবার কিন্তু এই নামগুলো বলেছে। তবে প্রতিবারই অদৃশ্য চাপে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে হলেও তিনজনের নাম সামনে এসেছে এবং তাঁরা তখন সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন—এটি তদন্তের জন্য ভালো একটি বিষয়। আশা করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের নামগুলো সামনে আসবে।