সুনামগঞ্জে অধিকাংশ প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় আসবে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র থেকে

টাকা
প্রতীকী ছবি

সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই ও শাল্লা) খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নির্বাচনে ব্যয় করবেন ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের ব্যবসা থেকে ব্যয় করবেন মাত্র এক লাখ টাকা। বাকি ৩৫ লাখ টাকাই আসবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, স্পেন, গ্রিস ও মালয়েশিয়া থেকে। তাঁর ভাই, বোন, ভাগনিসহ শুভানুধ্যায়ীরা এই টাকা দেবেন।

শুধু সাখাওয়াত হোসেন একা নন, সুনামগঞ্জের ৫টি সংসদীয় আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ৩৯ জন প্রার্থীর বেশির ভাগের নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা আসবে প্রবাসী আয় থেকে। এই অর্থ দেবেন তাঁদের প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা। কোনো কোনো প্রার্থী নিজেদের প্রবাসী আয়ও ব্যয় করবেন নির্বাচনে।

সুনামগঞ্জের সব উপজেলাতেই প্রবাসী রয়েছেন। এর মধ্যে জগন্নাথপুর ও ছাতক উপজেলায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বেশি। জেলায় জাতীয় কিংবা স্থানীয় যেকোনো নির্বাচনেই প্রবাসী প্রার্থী থাকেন। তাঁদের স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই দেশে এসে নির্বাচনী প্রচারণাতেও অংশ নেন; নানাভাবে সহযোগিতা করেন। এতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর হয়।
দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, সদস্য, সচেতন নাগরিক কমিটি, সুনামগঞ্জ

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব বিবরণী থেকে এই তথ্য জানা গেছে। হিসাব করে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জের প্রার্থীরা নির্বাচনে ব্যয় করবেন ৮ কোটি ৪৩ লাখ ২৬ হাজার ৪২৭ টাকা। এর মধ্যে প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা দেবেন ৪ কোটি ৯ লাখ ৩ হাজার টাকা। বাকি টাকা নিজেদের আয়, দেশে থাকা স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা দেবেন। এর মধ্যে তিনজন প্রার্থী দল থেকেও টাকা পাবেন বলে উল্লেখ করেছেন।

আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জ-১ আসন

হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ-১ আসনে (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর) জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী তোফায়েল আহমদ ব্যয় করবেন ২৫ লাখ। এর মধ্যে নিজের চাকরির বেতন থেকে পাঁচ লাখ; যুক্তরাজ্য, কানাডা ও কুয়েতে থাকা তাঁর চারজন শুভানুধ্যায়ী দেবেন আরও আট লাখ।

এ আসনে বিএনপির দলীয় চিঠিসহ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া দলের নেতা কামরুজ্জামান কামরুল নির্বাচনে ব্যয় করবেন ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের ব্যবসা থেকে পাঁচ লাখ, যুক্তরাজ্যে থাকা তাঁর স্ত্রী হেলী খানম দেবেন আরও পাঁচ লাখ। বাকি টাকা দেবেন দেশে থাকা স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী  মুজাম্মিল হক তালুকদার ব্যয় করবেন ২৫ লাখ ৫৩ হাজার, এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা দেবেন তাঁর ইতালিপ্রবাসী দুই ভাই। এখানে বিএনপির প্রার্থী আনিসুল হক ২৫ লাখ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ২৫ লাখ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাজী মুখলেছুর রহমান ব্যয় করবেন ৪০ লাখ টাকা। মুখলেছুর রহমানকে তাঁর দল ২০ লাখ টাকা দেবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

সুনামগঞ্জ-২ আসন

সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই-শাল্লা) বিএনপির প্রার্থী মো. নাছির চৌধুরী ব্যয় করবেন ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের কৃষির আয় থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। বাকি ১৩ লাখ টাকা দেবেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে থাকা তাঁর তিন ভাই। এখানে বিএনপির চিঠি পেয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া দলের আরেক নেতা তাহির রায়হান চৌধুরী ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আইন পেশার আয় থেকে ১০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে থাকার তাঁর দুই ভাই দেবেন আরও ১৫ লাখ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী ঋতেশ রঞ্জন দেবের ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দুই শুভানুধ্যায়ী দেবেন দুই লাখ।

এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির ব্যয় করবেন ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এই টাকার মধ্যে নিজের আইন পেশার আয় থেকে ২০ লাখ, বাকি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেবে দল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী শোয়াইব আহমদ যুক্তরাজ্যপ্রবাসী, তিনি নিজের বেতন থেকে নির্বাচনে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

সুনামগঞ্জ-৩ আসন

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহীনুর পাশা চৌধুরী নির্বাচনে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী তাঁর ছেলে, ভাই ও বোন মিলে দেবেন ১৭ লাখ টাকা। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। তিনি নিজের ব্যবসার আয় থেকে নির্বাচনে ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেনও দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে ছিলেন। তিনি নির্বাচনে নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইয়াসীন খান ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে নিজের আইন পেশা থেকে ১২ লাখ এবং প্রবাসী ভাই আলীনূর দেবেন ১৩ লাখ টাকা। এই আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুশতাক আহমদও দীর্ঘদিন ছিলেন যুক্তরাজ্যে, তিনি নির্বাচনে ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে নিজের প্রবাসী চাকরির আয় থেকে মাত্র ১ লাখ এবং বাকি ২৪ লাখ টাকা দেবেন তাঁর প্রবাসী স্ত্রী।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ আলী ব্যয় করবেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে ৩০ হাজার, বাকি ২ লাখ টাকা দেবেন তাঁর যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই ছেলে। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী হুসাইন আহমদের ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেবেন তাঁর প্রবাসী দুই স্বজন। এখানে আমার বাংলাদেশ পার্টির সৈয়দ তালহা আলম নিজের আয় থেকে ২৫ লাখ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৭ টাকা ব্যয় করবেন।

সুনামগঞ্জ-৪ আসন

সুনামগঞ্জ-৪ আসনে (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সামছ উদ্দিন নির্বাচনে ব্যয় করবেন ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৪ লাখ এবং বাকি ৩১ লাখ টাকা দেবেন তাঁর চারজন প্রবাসী স্বজন। স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া বিনএনপির নেতা আবিদুল হক নির্বাচনে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৩ লাখ টাকা এবং বাকি টাকার মধ্যে ২১ লাখ টাকা দেবেন তাঁর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সাতজন স্বজন।
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন ব্যয় করবেন ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা দেবেন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাঁর তিন ছেলেমেয়ে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাজমুল হুদা ব্যয় করবেন ১০ লাখ টাকা। নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৩ লাখ, আর ৫ লাখ টাকা দেবেন তাঁর দুজন প্রবাসী আত্মীয়।

আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আমিরুল ইসলাম ব্যয় করবেন ৩৭ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে ১৮ লাখ আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি ও মালয়েশিয়ায় থাকা তাঁর পাঁচজন আত্মীয়ের কাছ থেকে। এখানে বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলাম। তিনি নিজের আইন পেশার আয়, ভাই এবং শুভানুধ্যায়ীদের দেওয়া ২০ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পাটির (এলডিপি) মো. মাহফুজুর রহমান খালেদ নিজের আইন পেশার আয় থেকে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৭ টাকা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহীদুল ইসলাম নিজের শিক্ষকতার আয় ও আত্মীয়স্বজনের দেওয়া ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আজিজুল হক নিজের আয় এবং স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের দেওয়া ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।

সুনামগঞ্জ-৫ আসন

সুনামগঞ্জ-৫ আসনে (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) বিএনপির প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ নির্বাচনে ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের ব্যবসা থেকে ১০ লাখ এবং যুক্ত্যরাজ্যপ্রবাসী এক ভাই দেবেন আরও ৫ লাখ। জামায়াতে ইসলামীর প্রাথী আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম ব্যয় করবেন ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় ও সঞ্চয় থেকে ১০ লাখ, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই ছেলে ও এক ভাগনে দেবেন ২০ লাখ এবং দল থেকে পাবেন আরও ২০ লাখ।

এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের ব্যবসার আয় থেকে ১০ লাখ এব যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই ভাই দেবেন আরও ১৫ লাখ টাকা। জাতীয় পাটির প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের কোনো টাকা নেই। প্রবাসী ভাই, বোন, ভাগনে, মামা মিলে দেবেন ২৩ লাখ টাকা। দেশে থাকা এক ভাতিজা দেবেন আরও ২ লাখ।

স্বতন্ত্র প্রার্থী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ মুশাহিদ আলম তালুকদার ১৭ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে নিজের কৃষি ও ব্যবসার আয় ৫ লাখ। বাকি ১২ লাখ দেবেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী তাঁর তিন স্বজন। খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবদুল কাদির ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে নিজের চাকরি থেকে ৫ লাখ এবং তাঁর এক প্রবাসী ভাই দেবেন আরও ১০ লাখ টাকা।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সিরাজুল ইসলামের ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে নিজের আয় থেকে ৫ লাখ এবং যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী দুই স্বজন দেবেন আরও ১০ লাখ টাকা। এই আসনে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. আজিজুল হক নিজের ব্যবসার আয় থেকে নির্বাচনে ব্যয় করবেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সুনামগঞ্জের সব উপজেলাতেই প্রবাসী রয়েছেন। এর মধ্যে জগন্নাথপুর ও ছাতক উপজেলায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বেশি। জেলায় জাতীয় কিংবা স্থানীয় যেকোনো নির্বাচনেই প্রবাসী প্রার্থী থাকেন। তাঁদের স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই দেশে এসে নির্বাচনী প্রচারণাতেও অংশ নেন; নানাভাবে সহযোগিতা করেন। এতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর হয়।