গাজীপুরের কাপাসিয়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার মা–মেয়েসহ পাঁচজনকে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়। এ ঘটনার পর গ্রামজুড়ে শোক চলছে।
গতকাল শনিবার সকালে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বহুতল বাড়ি থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০), নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) ও ছেলে রসুল মিয়া (২৩)।
এ ঘটনায় শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়ার নাম উল্লেখে অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারজনকে আসামি করে কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। ফোরকান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। ঘটনার পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়। আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নিহত পাঁচজনের মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স গোপালগঞ্জের পাইককান্দি ইউনিয়নের উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর পর একনজর দেখতে সবাই ভিড় করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের পাশে উত্তর চরপাড়া গ্রামে মাতম চলছে। বাড়ির পাশে ছোট সড়কে মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা। পাশের মেহগনিবাগানে পৃথক দুটি মশারি টানিয়ে নারী ও পুরুষের মরদেহ গোসল করানো হচ্ছে।
বাড়িতে আহাজারি করছিলেন শারমিনের মা ফিরোজা বেগম ও বোন ফাতেমা বেগম। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেও তাঁদের কান্না থামাতে পারেননি। বড় বোন ফাতেমা বেগম বলেন, তিনি গাজীপুরে থাকেন। শারমিন ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর তাঁর বাসায় বেড়াতে যেতেন। তখন শারমিন প্রায়ই স্বামীর আচরণ নিয়ে কষ্টের কথা বলতেন। তিনি বলেন, ফোরকান অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। শারমিনের হাতে মুঠোফোন পর্যন্ত রাখতে দিতেন না। সংসারে অশান্তি থাকলেও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে শারমিন সবকিছু সহ্য করতেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে ফোরকানের সঙ্গে শারমিনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক বছর ঢাকায় বসবাস করলেও ছয় মাস আগে তাঁরা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় থাকা শুরু করেন। ফোরকান প্রাইভেট কার চালিয়ে সংসার চালাতেন।
বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খোঁড়া হয়েছে। কবরস্থানের প্রবেশপথে বাঁশ কাটতেও দেখা গেল কয়েকজনকে। প্রতিবেশী জগগুল মোল্লা, সাবিনা বেগমসহ কয়েকজন হত্যাকাণ্ডের জন্য নিহত শারমিনের স্বামীকে দায়ী করে প্রশ্ন তোলেন, ‘বাবা হয়ে কীভাবে সন্তানদের হত্যা করতে পারে?’
শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার আগের দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে মেয়ে শারমিন তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, ‘আব্বা, আমরা ২৪ মে বাসা ছেড়ে চলে আসব।’ পরদিন সকালে ফোরকানের ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে দ্রুত শারমিনের বাসার খোঁজ নিতে বলেন। এরপর তিনি বড় মেয়েকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিছুক্ষণ পর মেয়ের কাছ থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে–ছেলে, নাতনিদের জীবন শেষ করে দিয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’