যুদ্ধের এক মাসে দেশে কত জ্বালানি তেল এল

যুদ্ধ শুরুর পর গত এক মাসে দেশে ১১টি জাহাজে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল, ২২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। সব মিলিয়ে জাহাজে এসেছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল।

‘এমটি গ্রান কুভা’ নামের জাহাজটি জ্বালানি তেল নিয়ে এসেছে ২৬ মার্চছবি: মেরিন ট্রাফিক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এক মাস পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে দেশে ১১টি জাহাজে জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে। এসব জাহাজে এসেছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল। তবে যুদ্ধের কারণে নির্ধারিত আটটি জাহাজ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধের এক মাসে জ্বালানি আমদানির এই চিত্র পাওয়া গেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে। অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে জোর দিচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিও ঝুঁকিতে পড়ে।

বিপিসি সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর গত এক মাসে দেশে ১১টি জাহাজে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল, ২২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। সব মিলিয়ে জাহাজে এসেছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব জাহাজ নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি, সেগুলো নতুন সূচিতে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম জাহাজটি আসে ৩ মার্চ। ‘এমটি ওরিয়েন্টাল গ্রিনস্টোন’ নামের ওই জাহাজে ছিল ৩২ হাজার টন ডিজেল। সরবরাহ করেছিল ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। আর সর্বশেষ জাহাজটি আসে গতকাল শুক্রবার দুপুরে। সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আসে ‘এমটি ইউয়ান জিং হে’। এই তেলও সরবরাহ করেছে ইউনিপ্যাক।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে একই সময়ে নির্ধারিত আটটি জাহাজ প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন জ্বালানি নিয়ে দেশে পৌঁছাতে পারেনি। এসব জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল থাকার কথা ছিল।

এদিকে জ্বালানিসংকটের শঙ্কায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ভিড় ও বিশৃঙ্খলার চিত্র দেখা গেছে। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে, আবার কোথাও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে।

তবে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তেলের সংকট নেই। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নতুন উৎস থেকেও এ মাসে তেল পাওয়া যাবে। গত মাসে না জাহাজগুলোর মধ্যে চারটির বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে একটি গতকাল এসেছে। আরও তিনটি আসার বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এর বাইরে চুক্তি অনুযায়ী তেল আসছে।

সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে
ছবি: সংগৃহীত

তিন মাসে যত তেল আসবে

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব জাহাজ নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি, সেগুলো নতুন সূচিতে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে জুন পর্যন্ত একটি প্রাথমিক আমদানি পরিকল্পনা করেছে বিপিসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মে মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল, ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আনার পরিকল্পনা রয়েছে। জুন মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

দেশে তেলের কোনো সংকট আপাতত নেই। চুক্তিবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল আসছে এবং আসবে। ফলে সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
অনিন্দ্য ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

তবে এই সূচি স্থির নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চয়তার কারণে এটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ জোরদার করা হয়েছে। এসব উৎস থেকে তেল আসা শুরু হলে দেশে মজুত বাড়বে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

তাঁরা আরও জানান, সামনে সেচ মৌসুম শেষ হলে ডিজেলের চাহিদা কিছুটা কমে আসবে। একই সময়ে নতুন জাহাজ এবং ভারত থেকে পাইপলাইনে তেল আসতে থাকলে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা কম থাকবে।

সরকারও বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশে তেলের কোনো সংকট আপাতত নেই। চুক্তিবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল আসছে এবং আসবে। ফলে সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

আরও পড়ুন