নারায়ণগঞ্জে মা-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক, নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি

হত্যাকাণ্ডের পর গত মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের ভবনটি ঘিরে মানুষের ভিড়
ছবি: দিনার মাহমুদ

নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র নিতাইগঞ্জের ডালপট্টিতে মা ও সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে ধারালো ছুরি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিনের বেলায় এমন ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাজা এবং এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি করেছেন তাঁরা।

নিতাইগঞ্জ বাজার আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, ডাল ও গোখাদ্যের (ভুসি) পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র। এখান থেকে সারা দেশে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, ডালপট্টি এলাকায় ৮ নম্বর বি দাস রোডের ওই ভবনের নিচে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল মোতায়েন রয়েছে। অন্য দিনের তুলনায় সেখানে বেচাকেনা ও লোকজনের আনাগোনা কম। ব্যবসায়ী-বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত মঙ্গলবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে ওই ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে থেকে রুমা চক্রবর্তী (৪৬) ও তাঁর মেয়ে ঋতু চক্রবর্তীর (২২) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আল জোবায়ের (২৬) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, আল জোবায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটিকে জানিয়েছেন, বাড়ি থেকে টাকা ও সোনাদানা লুট করতে মা ও অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে হত্যা করেছেন। জোবায়েরকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

‘মাতৃভবন’ নামের ওই ভবনের মালিক স্বপন কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, দিনেদুপুরে ব্যস্ত এলাকায় ফ্ল্যাটবাড়িতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কিত। পরিবারের লোকজনও বাড়িতে থাকতে চাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, তিনি ছোট থেকে বড় হয়েছেন এই বাড়িতেই। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি।

ওই ভবনের ষষ্ঠ তলার যে ফ্ল্যাটে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটে সন্ধ্যা নন্দী (৫০) প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে অভিযুক্ত আল জোবায়ের তাঁদের ফ্ল্যাটে তিন-চারবার কলবেল বাজান। দরজার আই ডোর (দুরবিন) দিয়ে কে আসছেন, তা দেখার চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু আঙুল দিয়ে দুরবিন বন্ধ করে রাখায় কে বেল বাজাচ্ছে, দেখতে না পেয়ে তাঁরা দরজা খোলেননি। পরে পাশের ফ্ল্যাটে বেল বাজালে দরজা খুলে দেন রুমা চক্রবর্তী।

সন্ধ্যা নন্দী বলেন, তাঁরা দুরবিন দিয়ে দেখতে পান, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে রুমা চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ দেয় ওই ব্যক্তি। এ সময় ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে চিৎকার–চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পান। তিনতলা থেকে বাড়িওয়ালার স্ত্রী ও মেয়ে ওপরে উঠে আসেন। তখন তাঁরাও দরজা খুলে বের হন। এ সময় পাশের ফ্ল্যাটের দরজা নক করলে ওই ব্যক্তি (আল জোবায়ের) দরজা খুলে বলেন, ‘তোরা চলে যা।’ তখন তাঁর হাতের গ্লাভস ও মেঝেতে রক্ত দেখতে পান। ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। পরে তাঁরা ৯৯৯ ফোন করে পুলিশের সাহায্য চান। তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে তাঁরা আতঙ্কে আছেন। ওই সময় দরজা খুলে দিলে তাঁদের প্রাণ হারাতে হতো বলে মনে করেন সন্ধ্যা নন্দী।

এ ঘটনার তদন্ত গভীরভাবে হওয়া প্রয়োজন। কী কারণে ওই ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যবসায়ী-বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
শংকর সাহা, সাধারণ সম্পাদক, নিতাইগঞ্জ ব্যবসায়ী মালিক সমিতি

ভবনটির আরেক ভাড়াটে রতন কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, চিৎকার ও চেঁচামেচি শুনে লোকজন ভবনের মূল ফটকে তালা মেরে বন্ধ করে দেন। এরপর পুলিশ এসে ঘাতককে আটক করে। এভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজেদের আতঙ্কের কথা জানান তিনি।

নিতাইগঞ্জ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি শুধু ছিনতাই বা ডাকাতি বলে তিনি মনে করেন না। এ ঘটনার তদন্ত গভীরভাবে হওয়া প্রয়োজন। কী কারণে ওই ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যবসায়ী-বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, নিতাইগঞ্জে প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকার ওপরে বেচাকেনা হয়। এর মধ্যে ডালপট্টিতে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। তাই ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি।

আরও পড়ুন

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, হতাশাগ্রস্ত হয়ে ঋণের টাকা জোগাড় করার জন্য ছিনতাই করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য সংস্থাও তদন্ত করছে। নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সেখানে নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন