‘আমি ভিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছি, এটা অনেকে প্রশংসা করছেন’

ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচনী গণসংযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাফাইল ছবি: প্রথম আলো

তাসনিম জারা এবাড়ি–ওবাড়ি ঘুরে ভোট চাইছিলেন। তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৯ আসনে (খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা) স্বতন্ত্র প্রার্থী। এলাকাটি ছাড়ার মুহূর্তে কম বয়সী একটি ছেলে তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’ তাসনিম জারা সম্মতি দিলে ছেলেটি বলল, ‘এলাকায় অনেক চাঁদাবাজি ছিল। আপনি যদি আসেন (নির্বাচিত হোন), তাহলে যেন চাঁদাবাজি না হয়। এলাকায় কোনো খেলার মাঠ নেই। খেলাধুলায় থাকলে আমরা মাদক থেকে বিরত থাকতে পারি। খেলার মাঠের যেন ব্যবস্থা হয়।’ সোমবার নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে খিলগাঁওয়ের গৌড়নগর পূর্ব পাড়া (পানির ট্যাংক-সংলগ্ন) এলাকার দুপুরের দৃশ্য এটি।

তাসনিম জারা ছেলেটিকে আশ্বস্ত করেন যে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও তাই। খেলাধুলার জায়গা থাকার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচনের সময় যখন কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়, নির্বাচনের পর সে টাকা তোলার ব্যাপার থাকে। তাঁর সেই দায়বদ্ধতা নেই। নির্বাচিত হলে তিনি এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) দেখাবেন।

তাসনিম জারা ছেলেটির সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে পাশ দিয়ে ব্যান্ড পার্টি যাচ্ছিল এলাকার এক প্রার্থীর প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে। ব্যান্ড পার্টিকে যেতে দেওয়ার জন্য সবাই এক পাশে সরে দাঁড়ান। পরে প্রথম আলোকে ছেলেটি জানায়, তার নাম জারিফুর রহমান। সে গুলশান কমার্স কলেজে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়ে। সে এখনো ভোটার হয়নি। তাসনিম জারার সঙ্গে কথা বলেছিলেন আরেক তরুণ। তাঁর নাম দারুল আহমেদ। তিনি এলাকার ভোটার। পড়াশোনা করছেন সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে পঞ্চম বর্ষে। ব্যান্ড পার্টির দিকে একনজর তাকিয়ে দারুল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আপুর (তাসনিম জারা) প্রচার কিছুটা ভিন্ন। অন্য প্রার্থীরা যখন লাউডস্পিকার ব্যবহার করেন, শব্দদূষণ করেন, তখন তাঁর ক্ষেত্রে সে রকম কিছু দেখি না। নতুন রাজনীতি পাব তাঁর কাছ থেকে।’

তাসনিম জারা নিজেও জানালেন, তাঁর প্রচারের ভিন্নতা নিয়ে তিনি প্রশংসিত হচ্ছেন। তাঁর নির্বাচনী পোর্টাল অনুসারে, এখন পর্যন্ত ১৯ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী পেয়েছেন, যাঁরা তাঁর পক্ষে ভোট চাইছেন।

ঢাকা-৯ আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার। এবার ওই আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন মোট ১২ জন। এর মধ্যে দুজন নারী প্রার্থী।

স্বেচ্ছাসেবী চেয়ে আহ্বান

তাসনিম জারা গত ২৫ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর পক্ষে ভোট চাইতে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রয়োজন বলে জানিয়েছিলেন। ওই পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে রাস্তা বন্ধ করে শোডাউন আর মাইকিংয়ের দাপট, এগুলোর উদ্দেশ্য কিন্তু জনসেবা নয়। বরং সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোট নেওয়া। কিন্তু এই দাপটের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হলো, পরিচিত কারও একটি ফোন কল এবং ৫ মিনিটের একটি আন্তরিক কথোপকথন। আমরা এই “ব্যক্তিগত সম্পর্ক” ব্যবহার করেই পেশিশক্তির রাজনীতিকে হারিয়ে দিতে পারি। ঢাকা-৯ আসনে জেতার জন্য আমাদের প্রয়োজন আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার ভোট। এখন আপনারা যাঁরা আমাকে সমর্থন করছেন, তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র ৩০ হাজার মানুষ যদি দায়িত্ব নেন এবং প্রত্যেকে মাত্র ৫ জন করে ভোটারকে ফোন দিয়ে কনভিন্স করেন (রাজি করাতে পারেন), তাহলে আমাদের জেতার সম্ভাবনা প্রবল।’

তাসনিম জারার সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এখন পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী হয়েছেন ১৯ হাজার ২৬৮ জন (সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত)। এই তথ্য পাওয়া যায়, তাঁর পোর্টাল https://www.tasnimjara.com/ থেকে। ক্লিক করলে দেখা যায়, এক কোনায় ফুটবলের ছবিসংবলিত প্রজেক্ট ঢাকা-৯ লেখা। স্লোগান লেখা, ‘শোডাউন নয়, পরিবর্তন’।

গৌড়নগর পূর্ব পাড়ায় নির্বাচনী প্রচার শেষে তাসনিম জারা যান খিলগাঁওয়ের নাগদারপাড় বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে প্রচার চালানোর এক পর্যায়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নেমে আসে একটি পরিবার। পরে পরিবারটির সদস্য সোহরাওয়ার্দী সালাহউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা উত্তরায় থাকেন। তিনি ব্যবসায়ী। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী নিগার নাসরিন, মেয়ে ফাইরুজ জাহিন ও ছেলে ইহতেশাম সাজিন। তাঁরা তাসনিম জারাকে দেখে কথা বলার জন্য নেমেছেন।

তাঁরা ছবি তুলে চলে যাওয়ার পর তাসনিম জারার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবী চেয়েছিলেন। এতে সাড়াও পেয়েছেন ব্যাপক। জনগণ তাঁর ভোটের প্রচারের ভিন্নতা দেখে প্রশংসা করছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। আমি ভিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছি, এটা অনেকে প্রশংসা করছেন। মানুষ নতুন রাজনীতির জন্য কাজ করছেন। পরিচিত মানুষকে বলছেন আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য। একটু আগে যে পরিবারটি কথা বলে গেল, তাঁদের একজন বললেন, তাঁরা এই এলাকার ভোটার নন, কিন্তু এখানের ভোটার স্বজনকে বলেছেন, আমাকে যেন ভোট দেওয়া হয়।’

তাসনিম জারা আরও বলেন, অর্থ ও পেশিশক্তি ছাড়া রাজনীতি করা যায় না, এমন ধারণা রয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী হলে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে ফেলতে হবে, শোডাউন করতে হবে। মাইকিং করতে হবে। এগুলো আসলে জনগণের সেবা দেওয়ার জন্য করা হয় না। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোট নেওয়ার চিন্তা করা হয়। ‘আমরা ভেবেছি, এসব ছাড়া কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়,’ বলেন তিনি।

তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। একজনের অপরজনের প্রতি যে আস্থা, সেটার ওপর ভরসা রেখেছি। মানুষ খুঁজে খুঁজে পরিচিত মানুষকে বের করে আমার জন্য ভোট চাইছেন। এর পাশাপাশি পায়ে হেঁটে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছি। অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি মানুষের কাছ থেকে।’

তাসনিম জারা পেশায় চিকিৎসক। ফেসবুকে তাঁর অনুসারী ৭২ লাখ। এ দুটো বিষয় প্রার্থী হিসেবে তাঁকে সুবিধা দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সুবিধা দিচ্ছে। অনেক বছর ধরে অনেকে আমার কাজ দেখেছেন, আমাকে চিনেছেন। আমার প্রতি তাঁদের ভরসা তৈরি হয়েছে।’

ভোটাররা যা বললেন

গৌড়নগর পূর্ব পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা রেবেকা ইয়াসমিনসহ চার নারী ভোটারের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তবে রেবেকা ছাড়া আর কেউ নাম প্রকাশ করতে দিতে চাননি। তাঁরা বলেন, এলাকায় সরকারিভাবে পানির সরবরাহ নেই। ব্যক্তিগতভাবে পানি কিনে নেন তাঁরা। গ্যাস–সংকটও তীব্র। সেতুর অভাবে এখনো সাঁকো পার হতে হয়। এত বছরেও এখানের কোনো জনপ্রতিনিধি এসব সংকটের কোনো সমাধান করেননি। রেবেকা বলেন, ‘এলাকার সমস্যা সমাধান করবে, এমন প্রার্থী চাই আমরা। এখানে একটা ভালো স্কুল–কলেজ নেই। ভোটের আগে প্রার্থীদের দেখা যায়, ভোটের পর যেন তাঁরা এলাকায় আসেন, প্রতিশ্রুতি রাখেন সেটাই প্রত্যাশা।’

আর এম টেইলার্স অ্যান্ড লন্ড্রির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই যে রাস্তা দেখছেন, এই রাস্তাটা আমরা নিজস্ব টাকা দিয়ে বানাইছি। প্রতি ঘর থেকে টাকা নিয়ে বালু ফেলাইছি।’

মো. শরিফউদ্দিন নামে আরেক ভোটার বলেন, এলাকার উন্নয়ন চান তাঁরা।

ওই ভোটাররা বলেন, এলাকাটিতে দলীয় প্রতীকের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এবার তাসনিম জারার মতো নতুন যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের নামের সঙ্গে তাঁরা পরিচিত হচ্ছেন।

নাগদারপাড় বাসস্ট্যান্ডে তানভীর আহমেদ নামে এক ভোটারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি স্থানীয় বাস কাউন্টারে চাকরি করেন। বয়স ২৫ বছর হলেও এবার তিনি নতুন ভোটার। তিনি বলেন, তাঁরা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা। যৌথ পরিবার। পরিবারে ৪০ জন ভোটার রয়েছে। এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র। এই সংকট দূর হোক, এটা তাঁর প্রত্যাশা।

ভোটারদের প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে তাসনিম জারা বলেন, এই এলাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে হলেও সেবাগুলো খুব অবহেলিত। গ্যাস নেই, পানি কিনে খেতে হয় এলাকার বাসিন্দাদের, সাঁকো দিয়ে পার হয়ে যেতে হয়। তাঁরা এতখানি নিগৃহীত ও অবহেলিত। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সংসদ সদস্যের জবাবদিহির ওপর জোর দিয়েছেন।

আরও পড়ুন