এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ঋতুবৈচিত্র্যে বদল আসছে। অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, আবার বছরের দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের উপকূলীয় এলাকায় ভৌগোলিক কারণে লবণাক্ততা বেশি। তবে বেড়িবাঁধগুলোর ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করলে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। লবণাক্ততা–সহিষ্ণু যেসব ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, তা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ইটভাটার বিপদ
এফএও ও ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকায় বিপুল ইটভাটা গড়ে উঠছে। এসব ভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে মাটির সবচেয়ে ওপরের অংশ বা টপ সয়েল। আর পোড়ানো হচ্ছে কয়লা, যা মাটির দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি করছে। কয়লার ছাই মাটিকে বিষিয়ে তুলছে। ইটভাটায় পোড়ানো কয়লার ধোঁয়া বায়ু, পানি ও মাটিকে দূষিত করছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাহাজভাঙা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মাটি দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ছে। এসব এলাকার মাটি পরীক্ষা করে মার্কারি, ক্রোমিয়াম, লেডসহ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৩ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৯৫৯টি ইটভাটা ছিল। আর ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে ঢাকা ও এর পাশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় মোট ১ হাজার ৩০২টি ইটভাটা আছে। শুধু ঢাকা জেলাতেই ইটভাটা আছে ৪৮৭টি। ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের উৎস ইটভাটা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। তবে অবৈধ ইটভাটার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে পাওয়া যায়নি। ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বসতবাড়ির খুব কাছে ও আবাদি জমিতে অনেক ইটভাটা গড়ে উঠেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দেশের প্রায় দুই হাজার অবৈধ ইটভাটা ভেঙে দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে আমরা সব অবৈধ ইটভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর ঘটাব। এ ব্যাপারে আমাদের কার্যক্রম চলবে।’

ভবিষ্যতের শঙ্কা রূপপুর
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আগামী দিনের মাটির জন্য ঝুঁকি হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে। পাবনার রূপপুরের ওই প্রকল্প রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশ নির্মাণ করছে। ১৯৮৮ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কমে আসছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে ভারতও যুক্ত আছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে প্রকল্প এলাকায় মাটি দীর্ঘমেয়াদি দূষণের শিকার হয়। আবার যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা হয়, তাহলে ওই অঞ্চল ছাপিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে সামগ্রিকভাবে পরিবেশের জন্য বিপর্যয় তৈরি করবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে অনেক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে শঙ্কা–উদ্বেগ আছে। জাপানের মতো দেশ ফুকুশিমা শহরের বিপর্যয় ঠেকাতে পারেনি। আর আমাদের এখানে সামান্য রাসায়নিক গুদাম বা তৈরি পোশাক কারখানার দুর্ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থা নেই; সেখানে আমরা কীভাবে আশা করব এ ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারব।’

জাহাজভাঙা শিল্পের আপদ
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজের অন্যতম আমদানিকারক দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প এলাকার মাটি ওই জাহাজগুলো ভাঙার পর বের হওয়া ভারী ধাতুর কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এসব জাহাজ থেকে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, লেড, কপার, মার্কারির মতো ক্ষতিকর ধাতু বের হয়। সেখানকার মাটি ও বঙ্গোপসাগরের পানির সঙ্গে ভেসে গিয়ে তা বিভিন্ন এলাকায় দূষণ ঘটাচ্ছে। ওই এলাকার কৃষি–ফসল থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প এলাকায় মোট ১৬০টি জাহাজভাঙা ইয়ার্ড আছে, যার মধ্যে ৬০ থেকে ৭০টি চালু রয়েছে। সেখানে বছরে ১৮০ থেকে ২০০টি মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ এনে ভাঙা হয়। ওই জাহাজগুলোর ভাঙা অংশ থেকে রড, সিলভার, তামাসহ নানা ধাতব বস্তু সংগ্রহ করা হয়। আর এ থেকে বের হওয়া বর্জ্য বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় ভূমিতে ফেলা হয়।

বেলার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি আগের চেয়ে না কমে উল্টো আরও বেড়েছে। এত বছর ধরে জাহাজভাঙা শিল্প মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী, অর্থাৎ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী লাল তালিকাভুক্ত ছিল। গত মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর তা সংশোধন করে কমলার ‘ক’ বা অপেক্ষাকৃত কম পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এখন থেকে জাহাজভাঙা কারখানা স্থাপনের জন্য এবং জাহাজ ভাঙার জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করতে হবে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজভাঙা শিল্প চট্টগ্রাম উপকূলের জন্য তো বটেই, সামগ্রিকভাবে সারা দেশের মাটি ও পানি দূষিত করে তুলছে। এ শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার অনেক আশ্বাস আমরা শুনলেও তা বাস্তবে কখনো দেখতে পাইনি। এত দিন শুধু তেলবাহী ট্যাংকার আনা হতো। এখন যুদ্ধজাহাজ, পারমাণবিক জাহাজ থেকে শুরু করে আরও দূষণকারী জাহাজ আনা হচ্ছে। এ কারণে এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশের মাটি আরও বেশি দূষণের কবলে পড়বে।’

মাটিদূষণের অন্য কারণ ও কমানোর পথ
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, একসময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ছিল বিশ্বের অন্যতম ডিডিটি ব্যবহারকারী দেশ। মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই কীটনাশক বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করার পর বাংলাদেশেও এর ব্যবহার বন্ধ করা হয়। তবে এখনো বাংলাদেশে অর্গানোক্লোরিন নামের মারাত্মক ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মাটির উর্বরতার ক্ষতি করছে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নতুন নতুন জৈব বালাইনাশক উদ্ভাবন এবং তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত লবণাক্ততা দূর করে মাটিকে দূষণমুক্ত করার ২২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে খামার, পুকুর ও লবণাক্ত মাটিতে মাটির কলস স্থাপনসহ নানা ধরনের প্রযুক্তি। এ ছাড়া লবণাক্ত মাটিতে তরমুজ, বাঙ্গি, ঢ্যাঁড়সসহ নানা জাতের সবজি ও ফল চাষকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) মহাপরিচালক বিধান কুমার ভান্ডার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কৃষি খাতে যাতে কীটনাশকের ব্যবহার কমে আসে, এ জন্য আমরা কাজ করছি। উন্নত এবং নতুন প্রজন্মের কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জৈব বালাইনাশকের ওপরে জোর দিচ্ছি। তবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পের কারণে সেখানকার মাটিদূষণের কিছু প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সেগুলো কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছি।’

জাতিসংঘের প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের মাটিতে ভূতাত্ত্বিকসহ নানা কারণে আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার খাওয়ার ও সেচের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিক মাটিকে দূষিত করে তুলছে।