বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গোড়ার কথা

তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি। বাবার সঙ্গে লিচুর চারা ঝিকরগাছা বাজারে নিয়ে দুই আনায় বেচতেন কিশোর মোহাম্মদ আলী। সে সময় বরিশাল থেকে নৌকায় করে আমড়া, তেজপাতা ও পেয়ারার চারা আসত ঝিকরগাছায়। বেচাকেনা করতে গিয়ে মোহাম্মদ আলী চারা তৈরির কৌশল শিখে নেন। এরপর থেকে তিনি নিজেই বাসুদেবপুর বাজারে চারা নিয়ে বসতেন। পরে মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে অনেকে চারা তৈরির কৌশল শেখেন। ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে।

বাসুদেবপুর গ্রামটি যশোর শহর থেকে দক্ষিণে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মনিরামপুর উপজেলায় অবস্থিত। গ্রামে ৫০০ পরিবারের বাস। এর মধ্যে ৪০০ বাড়িতেই নার্সারি আছে। তবে গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক নার্সারি আছে ১০০টি। সম্প্রতি গ্রামটি ঘুরে দেখা গেছে, ফসলের মাঠে ধান, পাট নেই বললেই চলে। মাঠে মাঠে চারা বিক্রির ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকেই চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাসুদেবপুর গ্রামের বাজারটি ছোট, কিন্তু এ বাজারেই দোকান আছে ২০০টি। এর অর্ধেকের বেশি চারা বিক্রির দোকান।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গ্রামটিতে অন্তত ৫০০টি পরিবারের বাস। গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষের আয়ের উৎস গাছের চারা তৈরি করে বিক্রি করা। এই গ্রামে চারা তৈরির বিপ্লব দেখে পাশের চন্দ্রপুর, পলাশী ও বাগডোব গ্রামেও চারা তৈরিতে অন্তত ৫০ জন এগিয়ে এসেছেন।

চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা

বাসুদেবপুর বাজারের শুরুতেই এনামুল হকের একতলা বাড়ি। বাড়ির সঙ্গেই তিনি প্রায় এক একর জমিতে নার্সারি গড়ে তুলেছেন। বাড়িতে বসেই নারকেল, সুপারির চারা বিক্রি করতে দেখা গেল তাঁকে।

এনামুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছিলেন। ঢাকায় ভালো বেতনে চাকরি করতেন। করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে বছরখানেক আগে নার্সারির কাজ শুরু করেন।

এনামুল বলেন, ‘নিজেই চারা উৎপাদন করি, আবার অন্যদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রি করছি। এতে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, চাকরি আর করব না।’

৩৭ বছর আগে অন্যের জমিতে শ্রম দিতেন মো. মোশাররফ গাজী। একসময় পাঁচ শতক জমি ইজারা নিয়ে চারা তৈরির উদ্যোগ নেন। চারা তৈরি ও বিক্রিতে ভালো লাভ দেখে পরের বছর এক বিঘা জমিতে চারা তৈরি করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এখন নিজের ১৮ বিঘা জমিতে চারা তৈরি করছেন। চারার ব্যবসা করে তিনি বাসুদেবপুর বাজারে দোতলা মসজিদ ও মাদ্রাসা তৈরি করে দিয়েছেন। মসজিদের সামনে রাস্তার সঙ্গে চারা বিক্রির বিশাল একটি কেন্দ্র রয়েছে তাঁর। সেখানে দেশি ফলের চারার পাশাপাশি বিদেশি পার্সিমন, ডরিয়ান, রামভুটান, পিনাক বাটার, কিউই, শ্বেত চন্দন, রক্ত চন্দন, আপেলসহ বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে।

মোশাররফ গাজী বলেন, ‘একসময় আমার কিছুই ছিল না। অন্যের খেতে শ্রম দিতাম। চারা উৎপাদন ও বিক্রির ব্যবসা করে এখন সব হয়েছে। অনেক টাকা খরচ করে বাজারে ছয় শতক জমির ওপর দোতলা মসজিদ ও মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ করেছি। প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা এখানে খরচ দিতে হয়। তিন মেয়েকে ভালোভাবে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছি।’

মোশাররফ গাজীর মতো এই গ্রামের আরও চারজন চারার ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন। তাঁরা হলেন ভাই ভাই নার্সারির রুহুল আমিন, তরফদার নার্সারির রিয়াজ তরফদার, বিশ্বাস নার্সারির স্বপন কুমার বিশ্বাস ও বিসমিল্লাহ নার্সারির কুদরত আলী গাজী।

শুরুর উদ্যোক্তার কথা

মোহাম্মদ আলীর খোঁজ করতে করতে বাজারের ‘পুরাতন নার্সারি’তে গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল। এটি তাঁরই চারা বিক্রয়কেন্দ্র। গ্রামের সবার কাছে পুরোনো উদ্যোক্তা বলেই পরিচিত। তাই তিনি তাঁর নার্সারির নাম রেখেছেন ‘পুরাতন’।

ভরদুপুরে মোহাম্মদ আলীর নার্সারিতে গিয়ে দেখা গেল, চারা বিক্রির হিড়িক পড়েছে তাঁর দোকানে। চারা বিক্রির হিসাবনিকাশ খাতায় তুলে রাখছেন তিনি। ব্যস্ততার মধ্যেও কথা হলো তাঁর সঙ্গে।

শোনালেন বাসুদেবপুরে গ্রামে নার্সারিশিল্পের গোড়ার কথা। জানালেন, তাঁর বাবাই শুরু করেছিলেন নার্সারির ব্যবসা। তিনি ৩৫ বছর আগে মারা গেছেন। মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, ‘আমাদের গ্রামে অত্যন্ত ভালো মানের চারা তৈরি হয়। অন্য এলাকার তুলনায় দামেও কম। যে কারণে দিনাজপুর, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেটসহ সারা দেশের ব্যবসায় ও কৃষি উদ্যোক্তারা আমাদের কাছ থেকে চারা কিনে নিয়ে যান।’ মোহাম্মদ আলী চারা তৈরি ও ব্যবসা করে ২৫ বিঘা জমি কিনেছেন। পাকা বসতবাড়ি বানিয়েছেন। সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে এক ছেলেকে স্নাতকোত্তর পাস করিয়ে ব্যবসায় বসিয়েছেন, এক ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন এবং তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বাসুদেবপুর গ্রামের নার্সারি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে কারও যদি কৃষিঋণ প্রয়োজন হয়, তাহলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন