অথচ ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত পাখিটি বাগেরহাট অঞ্চলে ছিল প্রচুর সংখ্যায়। এমন কোনো গ্রাম ছিল না,Ñযে গ্রামে এদের দেখা যেত না। শোনা যেত না ডাক, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে। ফসলের খেতে বেশি দেখা যেত ধান-শর্ষে-তিল বিভিন্ন রকম ডালের বীজ ছড়ানোর পরে। তখন বড় মাঠগুলোতে ছিল সারি সারি জিকাগাছ, ছিল পতিত জমি, ঝোপালো গাছের জঙ্গল। বাসা থেকে ডিম এনে বাল্য-কৈশোরে আমি নিজেও ডিমভাজা খেয়েছি, রাতে চুপিসারে গাছে চড়ে ডিমের তা-য়ে বসা পাখিটিকেই ধরে ফেলেছি অনেকবারই। ডিম তো প্রায় জালালি কবুতরের ডিমের মতোই বড়।
পাখিটিও আকারে-গড়নে প্রায় জালালি কবুতরেরই সমান। দৈর্ঘ্যে জালালি কবুতর ৩৩ সেমি, ওজন ২২৫ গ্রাম। জালালি কবুতরের জাতভাই এই পাখিটির দৈর্ঘ্য ৩২ সেমি, ওজন ১৩৫ গ্রাম। গ্রামবাংলায় তখন (এখনো) পোষা হতো পাতিঘুঘু। ওই ঘুঘু দিয়ে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বুনো ঘুঘু শিকার করা হতো। উল্লিখিত পাখিটির ছানা ছোটবেলায় শখ করে পুষে ‘শিকারি ঘুঘু’ বানাতে চেয়েছিলাম। সফল হইনি। এরা পাতিঘুঘুর মতো শিকারি ঘুঘু হয় না। তবে খাঁচার পাশে ‘হাত আয়না’ ধরলে সে আয়নায় নিজের প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে প্রবল আক্রমণে যেতে চায়। এগুলোর ছানা এনে পোষ মানানোও বেশ কঠিন কাজ। খেতে চায় না সহজে।
বাগেরহাট অঞ্চল থেকে এই পাখিদের নাই হয়ে যাওয়ার তিনটি কারণের অন্যতম কারণ শিকারিদের নির্বিচার এয়ারগান নিয়ে শিকার। তবে এবার দীর্ঘ ২৩ দিন বাড়ি থাকার সময় জানলাম সরকারিভাবে এয়ারগান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হয়তো এই পাখিরা ফিরে আসবে আবার বাগেরহাটে।
পালকে প্রসাধন শেষে পাখিটি উড়াল দিয়ে বসল গিয়ে ভিটাবাগানটা থেকে মাঠের দিকে হাতা বাড়িয়ে থাকা আমগাছের ডালখানায়। ওমা, আরেকটি পাখি বাসা ছেড়ে উড়ে এসে নামল মাটিতে! ডানার আড়ষ্টতা কাটাচ্ছে ওটা। এতক্ষণ ডিমে তা দিয়েছে তো! এখন পালাবদলের সময়।
আমাদের সবার মনটা অপার্থিব ভালো লাগায় শীতল হয়ে গেল। ফিরে আসবে বাল্য-কৈশোরের চিরচেনা পাখিটা? আমার গ্রামে?
পাখিটির নাম ধলা ঘুঘু, ধলিয়া ঘুঘু, মালা ঘুঘু ও ধইলে ঘুঘু, ধবল ঘুঘু। ইংরেজি নাম ইউরেশিয়ান কলারড ডাভ। বৈজ্ঞানিক নাম streptopelia dococto। একনজরে বালু-বাদামি রঙের ঘুঘু পাখি। ঘাড়ের ওপরে কালো রেখা টানা। গোলাপি পা ও ঠোঁট। মাটিতে নেমে হেঁটে হেঁটে খায় নানা রকম শস্যদানা ও বীজ। বছরের সব সময়েই এগুলোর বাসা দেখা যেতে পারে। সরু ঘাস-লতা-শিকড় ও ডালপালা দিয়ে গোলাকার বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে দুটি। ডিম ফুটে ছানা হয় ১২ থেকে ১৭ দিনে। সব ধরনের কবুতর ও ঘুঘুর মতো এরাও ছানাদের ‘কবুতরের দুধ’ পান করায়। পুরুষ ও মেয়ে উভয়েই গলার থলিতে ক্ষীরের মতো অর্ধতরল তৈরি করতে জানে।