ধাইরা

ধাইরা ফুল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে তোলা ছবি l লেখক
ধাইরা ফুল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে তোলা ছবি l লেখক

আমরা সবাই বৃক্ষ চিনি। বৃক্ষ মূলত সুস্পষ্ট একক কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ভিদ। বৃক্ষ শুধু বাতাস ও ছায়া দেয় না, একটি বৃক্ষকে কেন্দ্র করে নানান ধরনের জীবকুল বেড়ে ওঠে। এ তালিকায় থাকতে পারে পিঁপড়ে, পাখি, পতঙ্গ বা অন্য কোনো উদ্ভিদ। সাধারণত বৃক্ষের ওপর মিথজীবী (লাইকেন), পরাশ্রয়ী (অর্কিড) ও পরজীবী (স্বর্ণলতা) ধরনের গাছপালা জন্মে। পরাশ্রয়ী ও পরজীবী গাছপালা পরগাছা নামেই পরিচিত। আমাদের দেশে বনের গাছপালায় সবচেয়ে বেশি পরগাছা দেখা যায়। বসতবাড়িতে সাধারণত আমগাছে ও মেঘ শিরীষগাছে পরগাছা দেখা যায়।
ধাইরা একটি অর্ধপরজীবী উদ্ভিদের অতি সুন্দর ফুল। এটি কোথাও বাজরাংগি, কোথাও ফরল্যা নামে পরিচিত। সাধারণত পোষক গাছের সঙ্গে সংযোগস্থলে চোরকাঁটা তৈরি করে যুক্ত থাকে। সাম্প্রতিক গবেষণা তথ্যমতে, প্রায় ৪০১ প্রজাতির গাছের ওপর এটি জন্মে। বহু শাখান্বিত গুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদের কাণ্ড প্রায় ১ মিটার লম্বা হয়। বাকল কালচে ধূসর। পাতা সবুজ, খানিক লম্বাটে। আকৃতিতে ভিন্ন রকম—ডিম্বাকার, আয়তাকার বা তির্যক। পাতার কিনারা ঢেউখেলানো ও মধ্যশিরা সুস্পষ্ট।
ধাইরা ফুল মৌটুিস, শালিক, টিয়ে, ফুলঝুড়ি পাখিদের অতি পছন্দের ফুল। ফুলের মধু খেতে পাখিরা ভিড় করে। ফুল ফুটলে দৃষ্টি কাড়ে পথিকের। সবুজ পাতার মাঝে টকটকে লাল কিংবা লাল-হলুদ ও কমলা জরোয়া সেট পরে ঝুলে থাকে। ঢাকার রমনা পার্কের ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের অনেক গাছেই ধাইরা দেখা যায়। ফুল না ফুটলে নজরে পড়ে না। সবুজ পাতা আশ্রয়ী গাছের পাতার সঙ্গে মিশে থাকে। রমনা পার্কের কাঞ্চন ফুলের গাছের সারির কাছে কয়েকটি গাছে ধাইরা আছে। পার্কের পাখিদের সঙ্গে সঙ্গে বাদামি ও পাঁচডোরা কাঠবিড়ালিদের আনাগোনা সব সময় থাকে ধাইরা ফুলে।
প্রায় সারা বছর ফুল ফুটলেও হেমন্তে যেন ফুলের জোয়ার আসে। ফুল ৩-৬ সেমি লম্বা। রং কমলা, হলুদ লাল বা টকটকে লাল। বৃত্যংশ ৩-৭ মিলিমিটার। পাপড়ি মসৃণ, দলনল বক্র, পাদদেশ থেকে ওপরের দিকে ক্রমশ বর্ধিত। পুংকেশর পাঁচটি।
হিমালয়, শ্রীলঙ্কা, মালয় দ্বীপপুঞ্জ ও উষ্ণমণ্ডলীয় অস্ট্রেলিয়ায় এ ফুল দেখা যায়। বাংলাদেশে পরজীবী গুল্ম হিসেবে সব জেলায় দৃশ্যমান। এটি বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের ক্ষতিসাধন করে। আদিবাসীরা এই উদ্ভিদের সব অংশই ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। বীজ ও পাখিদের মাধ্যমে বিস্তার ঘটেছে। ধাইরার বৈজ্ঞানিক নাম dendrophthoe falcate, পরিবার Loranthaceae। ইংরেজি নাম Honey suckled mistletoe।