default-image

বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢোকার পথে উদালের দেখা পেলাম। কদিন মাত্র আগে হলদে রঙের ফুল ঝরিয়েছে। উদাল পর্ণমোচী, মাথা ছড়ানো ও ধূসর সাদা বাকলওয়ালা গাছ। এটি বাংলাদেশসহ ক্রান্তীয় এশিয়ার একটি প্রজাতি। অধ্যাপক জসীম উদ্দিন গাছটি দেখিয়ে জানালেন, উদালও বাংলাদেশের মহাবিপন্ন প্রজাতির তালিকাভুক্ত উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত।

বাগানে আরেকটু এগোতেই দেখা বাংলাদেশে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকায় থাকা বিপন্ন প্রজাতির আগরের সঙ্গে, যে গাছ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় দামি সুগন্ধি। দুই কদম পা বাড়াতেই সামনে যেন হাজির হলো বিপন্ন উঁচু বৃক্ষ গর্জনের কয়েকটি চারা। এরপর সাক্ষাৎ ম্যাগনোলিয়ার সঙ্গে। বাগানের মাঝে বুক ফুলিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিকান বাওবাব, বয়সের তুলনায় যার স্বাস্থ্য বেশ ভালো। পূর্ব পাশে আকাশ ছুঁয়েছে তেলসুর, বয়স যার ৭০ থেকে ৮০ বছর, যাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে অনেক জাতের লতানো উদ্ভিদ। এরপরই দেখলাম বিরল প্রজাতির জিমনোস্পার্ম বা বাঁশপাতা বৃক্ষের, সচরাচর যা এ দেশের জঙ্গলে চোখে পড়ে না।

এ ছাড়া উরি আম, লতা আম, সুন্দরী বৃক্ষ, বিড়ি পাতা, পালাম, রক্তচন্দন, বিলাতি বেল, রুটি ফল, পলাশ, ডেফল, বাস্কেট বাদাম, পাইন, মেন্দা, মাধবীলতাসহ নানা জাতের বিপন্ন উদ্ভিদের সমারোহ সেখানে।

প্রায় ৬০০ একর জায়গাজুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অবস্থান। পুরো ক্যাম্পাসে ‘প্রভাবশালী’ গাছের মধ্যে রয়েছে রেইনট্রি, মেহগনি, দেবদারু, জারুল, তেলসুর, কৃষ্ণচূড়া ও নাগেশ্বর। পশুপাখির আশ্রয়স্থল, বাসা ও খাবারের উৎস এ গাছগুলো।

তবে কার্জন হলের বোটানিক্যাল গার্ডেন সৃজন করা হয়েছে মূলত দেশের দুর্লভ, বিপন্নপ্রায় উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখতে। আর সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রয়োজনে; চারপাশের উদ্ভিদের পূর্ণাঙ্গ ধারণা যাতে তারা পায়। তবে গাছগুলোর পরিচিতিসূচক কোনো তথ্য সেখানে দেখা গেল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কত প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে, তার উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে ২০১৬ সালের এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, ৫৪১ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে দেশি উদ্ভিদ মাত্র ৪১ শতাংশ। অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহা. আবুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য’ শিরোনামের ওই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে, ওই বছরের জুনের সংখ্যায়।

গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, এই উদ্ভিদগুলো ১১৭টি ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের সদস্য। ৪৭ শতাংশ প্রজাতির উদ্ভিদই মাত্র ১৬টি পরিবার থেকে এসেছে।

default-image

৫৩ প্রজাতির উদ্ভিদ এসেছে অন্য ১০১টি পরিবার থেকে। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ৫৪১ ধরনের উদ্ভিদের ৩৭ শতাংশ বিরুৎ, ২৯ শতাংশ বৃক্ষ, ২১ শতাংশ গুল্ম, ১১ শতাংশ আরোহী, ২ শতাংশ এপিফাইট ও ০.২ শতাংশ পরগাছাজাতীয় উদ্ভিদ।

অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত এলাকায় কোনো উদ্ভিদ রোপণ করা হলে বিপন্ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের নাম বিবেচনা করা উচিত, যাতে পশু, পাখি ও মানুষের উপকারে লাগে, বাংলার ঐতিহ্য রক্ষা হয়। বট, পাকুড়, শিমুল, পারুল, পলাশ, হিজল, ছাতিম, কদম, শাল, তেঁতুল, বৈলাম, গর্জন, তেলসুর, চাপালিশ, বাটনা, কত রকমের দেশি গাছ রয়েছে আমাদের।

দেশের এই উদ্ভিদবিজ্ঞানীর কথাটা যেন মনে বাজতে থাকল। বিকেল নাগাদ কার্জন হল থেকে বেরোনোর সময় ভাবছিলাম, ১০০ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বোটানিক্যাল গার্ডেনে থাকতে পারত আরও বেশিসংখ্যায় দুর্লভ ও বিপন্নপ্রায় উদ্ভিদ। এই বাগান আরও সমৃদ্ধ হবে, এমনই প্রত্যাশা।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন