default-image

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ কৃষি অনুষদের একদল ছাত্রকে নিয়ে শিক্ষা সফরে গেছি শ্রীমঙ্গলে। সকালে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা শেষে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গেলাম। ঘণ্টা খানেক ঘোরাফেরার পর একজনের দেখা পেলাম। ক্যামেরায় একটা মাত্র ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গেই সে পালিয়ে গেল। আফসোস, ওকে ভালো করে দেখতে পারলাম না।
দ্বিতীয়বার ওর দেখা পেলাম বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ও ফরেস্ট রেঞ্জার বন্ধু প্রয়াত মুনির আহমেদ খানের সঙ্গে মৌলভীবাজারের আদমপুর বিটে। পাখির খোঁজে সহকর্মী জীবন, সদরুলসহ মুনির ভাইয়ের সঙ্গে আদমপুরের সর্পিল ছড়ায় হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে যেই না একটা বড় গাছের নিচে এসেছি, তখনই মাথার ওপর কী যেন এটা পড়ল। কেউ ঢিল ছুড়ল নাকি? ওপরে তাকাতেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। দুই বছর আগে লাউয়াছড়ায়ÿ ক্ষণিকের জন্য যাকে দেখেছিলাম, আজ সে আমাদের ওপরে গাছের ডালে বসে মনের সুখে পাকা ডুমুর খাচ্ছে। কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে গোটা পাঁচেক ক্লিক করলাম। এরপর থেকে অবশ্য প্রতি সফরেই হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ওকে নিয়মিত দেখছি।
এতক্ষণ যার কথা বললাম, সে হলো এ দেশের এক দুর্লভ স্তন্যপায়ী প্রাণী উল্টোলেজি বানর (Northern Pig-tailed Macaque, Pig-tailed Macaque, Burmese Pig-tailed Macaque)। কুলু বান্দর, উলু বান্দর, সিংহ বানর, ছোটলেজি বানর বা শূকরলেজি বানর নামেও পরিচিত। Cercopithecidae গোত্রভুক্ত প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Macaca leonine। বর্তমানে এ দেশে এরা বিপন্ন ও পুরো বিশ্বে সংকটাপন্ন বলে বিবেচিত।
উল্টোলেজি বানরের নাকের আগা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৪০-৬০ সেন্টিমিটার এবং লেজ ১৮-২৫ সেন্টিমিটার। ওজন ৪ দশমিক ৫ থেকে ১২ কেজি। শূকরের মতো ছোট লেজটি ওপরের দিকে ওল্টানো। দেহের ওপরের লোম জলপাই-ধূসর, নিচটা ধূসর-সাদা ও মুখমণ্ডল গোলাপি। মাথার মাঝখানটা চ্যাপ্টা ও সেখানকার লোম কালচে। দলনেতার মাথায় কখনো কখনো সিংহের মতো কেশর দেখা যায়।
সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে থাকে। এরা দিবাচর, বৃক্ষবাসী ও ভূমিচারী। শক্তসমর্থ পুরুষের নেতৃত্বে ¦স্ত্রী, পুরুষ ও বাচ্চা মিলে ৫-২৫টির দলে বাস করে। পুরুষ বেশ রাগী; কাউকে ভয় দেখানোর জন্য দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ভেংচি কাটে। নিজেদের মধ্যে বেশ মারামারি করে। স্ত্রী তুলনামূলকভাবে শান্ত। ফল, মূল, কচি পাতা, কুঁড়ি, কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া, পাখির বাচ্চা ইত্যাদি খায়। খাদ্যাভাবে কখনো কখনো শস্য খেতেও হানা দেয়। এদের গলার স্বর কর্কশ, কাশির মতো ‘খক-খক-খক-খক’ আওয়াজ করে।
উল্টোলেজি বানর সারা বছরই প্রজনন করতে পারে; তবে মার্চ-জুনেই বেশি করে। স্ত্রী ১৬২-১৮৬ দিন গর্ভধারণের পর সচরাচর একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। বাচ্চারা এক বছর বয়সে দুধ ছাড়ে এবং তিন-চার বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। এরা ১০-১২ বছর বাঁচে। দিনে দিনে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কাজেই সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে বিপন্ন এই বানরগুলো অচিরেই এ দেশ থেকে হারিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন