
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর বাজার থেকে ট্রলারে চেপে পাতলাই নদী দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর মেন্দিপাতা গ্রামের সামনে এসে থামলাম। নৌকার ছাদের যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার ঠিক উল্টো পাশে একটা বড় ন্যাড়া গাছের মগডালে পাখির বিশাল এক বাসা দেখলাম। এত বড় বাসা জীবনে কম দেখেছি। মিনিট দুয়েক মাত্র অপেক্ষা করেছি, এর মধ্যেই বিশাল আকারের এক ইগলকে বাসার দিকে আসতে দেখা গেল। ওড়ার ভঙ্গি ও দেহের আকার দেখে ওকে চিনতে অসুবিধা হলো না। বিশাল পাখিটি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল। আর মুহূর্তেই আরেকটি পাখি বাসার ভেতর থেকে যেন জেগে উঠল! ওর চেহারা এবং পালকের রংই বলে দেয় যে ও একটি ছানা। কয়েকটি ছবি তুললাম।
এরা এ দেশের এক মহাবিপন্ন পাখি কুড়াবাজ (Pallas’s Fish Eagle, Pallas’s Eagle বা Band-tailed Fish Eagle)। কুড়া, কুড়ল, কোড়ল বা পালাস-এর কুড়া ইগল নামেও পরিচিত। Accipitridae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Haliaeetus leucoryphus।
প্রাপ্তবয়স্ক কুড়াবাজের দৈর্ঘ্য ৭০ থেকে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং প্রসারিত ডানা ১৮০ থেকে ২০৫ সেন্টিমিটার। আকারে স্ত্রী কিছুটা বড়। দেহের রং ঘন বাদামি। স্ত্রী ও পুরুষের পালক একই রঙের। তবে ঘাড় ও মাথা হালকা হলদেটে থেকে সাদা এবং কাঁধ-ঢাকনি কিছুটা গাঢ়। পিঠ কালচে-বাদামি, দেহের নিচটা লালচে-বাদামি। ডানার নিচটা কালো। কালো লেজে চওড়া সাদা টান। চোখ হলুদ। বাঁকানো ঠোঁটটি হলুদাভ ও আগা কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো দেহ গাঢ় বাদামি। ঠোঁট ছোট ও কালচে-ধূসর। লেজ লম্বা এবং তাতে কোনো সাদা টান নেই।
কুড়াবাজ দুর্লভ আবাসিক পাখি। বর্তমানে বিশ্বে সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। সিলেট, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের হাওর, বিল ও উন্মুক্ত জলাভূমিতে বাস করে। সচরাচর জোড়ায় থাকে। গাছ কিংবা মাটিতে বসে বা আকাশে উড়ে খাদ্য খোঁজে। মাছ মূল খাদ্য। তবে সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, জলচর পাখি এবং মরা প্রাণীও খায়। লম্বা নখ দিয়ে পানি থেকে শিকার তুলে নেয়। কখনো কখনো উড়ন্ত হাঁসের ঝাঁক থেকে কোনো একটিকে নখে গেঁথে নেয়।
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি প্রজননকাল। সারা জীবনের জন্য জোড় বাঁধে। জলার কিনারায় বড় কোনো গাছের মগডালে ডালপালা ও ঘাসপাতা দিয়ে বিশালাকৃতির মতো বাসা বানায়। একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। সাদা রঙের ২ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দিয়ে ৪০ থেকে ৪৫ দিনে বাচ্চা ফোটায়। নীল আকাশে ডানা মেলতে বাচ্চাদের ৭০ থেকে ১০৫ দিন সময় লাগে। এরপরও বাচ্চারা আরও মাস খানেক বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। আবাসভূমি কমে যাওয়া, বড় গাছের অভাব, ফসলের খেতে কীটনাশকের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে দিনে দিনে সংখ্যা হ্রাস পেয়ে বর্তমানে এরা মহাবিপন্ন পর্যায়ে চলে এসেছে।