বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন যাঁদের দায়িত্ব, তাঁদের জন্যই তো এই প্রকল্প। তাহলে উচ্ছেদটা করবে কে? প্রসঙ্গত, ৫১ একরের পাহাড়টি কক্সবাজারের ঝিলনজা মৌজায় অবস্থিত, যা একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা।

এবার সেই ঝিলনজা মৌজার বন ও পাহাড়ে জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের আয়োজন চলছে। উদ্যোক্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং বন বন্দোবস্তের দায়িত্বে আছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঝিলনজা মৌজাকে রক্ষিত বন ঘোষণা করে।

১৯৮০ সালে এই মৌজার পাহাড়ি বনভূমিকে সরকার জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। জাতীয় উদ্যান অর্থই হচ্ছে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। পরিবেশগত তাৎপর্য বিবেচনায় কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ও সংলগ্ন সবুজ পাহাড়ি বনভূমিসমৃদ্ধ এলাকাকে সরকার ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে, যার মধ্যেও রয়েছে ঝিলনজা মৌজা। আর সবকিছুর ওপরে আছে সংবিধান। সংবিধানে ১৮(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বেই সংসদ কর্তৃক পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জলাশয়, বন ও বন্য প্রাণী রক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রক্ষিত বন অবমুক্ত করার সুযোগ নেই

উল্লিখিত আইনি মর্যাদাপ্রাপ্ত ভূমি ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার ও শ্রেণি পরিবর্তনে রয়েছে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। বন আইন অনুযায়ী ঘোষিত সংরক্ষিত বন অবমুক্ত করার সুযোগ থাকলেও রক্ষিত বন অবমুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। রক্ষিত বনে, জাতীয় উদ্যানে এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় প্রাকৃতিক বন ও গাছপালা কাটা বা আহরণ এবং ভূমির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন হতে পারে, এমন সব কাজ নিষিদ্ধ। পাহাড় ও পাহাড়ের ঢালু বন্দোবস্ত প্রদান করা যাবে না এবং এমন ভূমিকে বনায়নের জন্য বন বিভাগকে হস্তান্তর করতে হবে বলে এক আদেশ দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। প্রশাসনিক বিধান অনুযায়ী বনভূমি হস্তান্তরযোগ্য নয়। রক্ষিত বনভূমি খাসজমি হিসেবে ১ নম্বর খতিয়ানে জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত হলেও তা ‘বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ বলে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ রয়েছে। আপিল বিভাগ এক রায়ের মাধ্যমে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় কক্সবাজার জেলার ঝিলনজা মৌজায় সব ধরনের ইজারা দেওয়া এবং স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। দেশের বনভূমির বিরুদ্ধ ব্যবহার রোধে দায়ের করা অন্য এক মামলায় হাইকোর্ট বনভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। আরেকটি জনস্বার্থমূলক মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ দেশের বনভূমির অব্যবস্থাপনা ও অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে গেজেটভুক্ত সব বনভূমি সরকারকে বন আইনের অধীনে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

এত সব আইনি নিষেধাজ্ঞা আর আদালতের নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় কেটে, বন কেটে আর ঝরনা ভরাট করে প্রশাসনের জন্য তৈরি হবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র! সেখানে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা শিখবেন পরিবেশ কেন রক্ষা করতে হবে, টেকসই উন্নয়ন কী, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিবেশ রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বনের ভূমিকা কী, পরিবেশ রক্ষা নিয়ে সংবিধানে কী বলা আছে, কেন দেশে বিদ্যমান ৮ শতাংশ বনভূমিকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, কীভাবে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস মহামারির মতো বিপদ ডেকে আনতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আর জাতি দেখবে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, যাঁরা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাঁরা কীভাবে ক্ষমতার প্রভাবে ৭০০ একর পাহাড়ি রক্ষিত বন এবং বিপন্ন হাতি, সাপ, প্যাঁচা, ময়নার মতো বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে নিজেদের জন্য একটি প্রশাসনিক একাডেমি করছেন।

এত জমি প্রয়োজন কেন

যে দেশে বন উজাড়ের গড় হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক বন উজাড়ের গড় হারের (১ দশমিক ৩) দ্বিগুণ, সে দেশে এমন প্রস্তাব কীভাবে সম্ভব? যদি জাতীয় সংসদ ২০০ একরের মতো ভূমির ওপর স্থাপনা নিয়ে চলতে পারে, তবে সরকারি কর্মকর্তাদের কেন প্রশিক্ষণের জন্য ৭০০ একর জমি প্রয়োজন? কেন সাভারের প্রশিক্ষণ একাডেমি ভবনের উচ্চতা এবং আয়তন বাড়িয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না?

জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণ একাডেমি করার ইচ্ছায় দুর্বল বাদ সেধেছে বন বিভাগ। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তি মানে না ভূমিশ্বর। বন্দোবস্তের জন্য প্রস্তাবিত ভূমির মধ্যে ৪০০ একর যে পাহাড় ও ৩০০ একর যে ছড়া, তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে প্রস্তাবিত জমির দাম উল্লেখ করা হয়েছে চার হাজার কোটির ওপরে। ভূমি মন্ত্রণালয় এ অমূল্য ভূমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে এক লাখ এক হাজার টাকায় বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকও প্রশাসনেরই অংশ। এখানে স্বার্থের সংঘাত নিশ্চয়ই আছে, যা নেই তা হলো জনস্বার্থের বিবেচনা।

পাহাড় ও ছড়া যে ধ্বংস করা যায় না, সেটি নিশ্চয়ই ভূমি মন্ত্রণালয় জানে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ প্রদানকারী কর্মকর্তা কি সাভারে লোকপ্রশাসন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেননি? সেখানে দেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ সম্পর্কে তাঁকে জানানো হয়নি, এ কথা কেমন করে মানা যায়? এমন না জানা কি কেবলই ‘সরল বিশ্বাসে অজ্ঞতা’, নাকি সংবিধান, আইন ও জনস্বার্থ অস্বীকারে প্রশাসনিক ঔদ্ধত্ব? এমন ঔদ্ধত্বপূর্ণ প্রশাসনই কি এ দেশের জনপ্রশাসন?

সংসদীয় কমিটির আপত্তি

সম্প্রতি বন অধিদপ্তরের আপত্তিকে সমর্থন জানিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি এ বন্দোবস্তে আপত্তি দিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ৭০০ একর পাহাড়ি বনভূমি ও ছড়ায় প্রশাসনিক একাডেমি স্থাপনের জন্য ইতিপূর্বে ‘পাহাড় ও গাছ কাটা যাবে না’ শর্তে অন্তঃসারশূন্য প্রাথমিক অনুমোদন দিলেও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে পরিবেশ অধিদপ্তর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে না। সংসদীয় কমিটির এ বৈঠকে উপস্থিত থেকে পরিবেশমন্ত্রীও চূড়ান্ত অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন বলে আমরা গণমাধ্যম মারফত জেনেছি।

সংসদীয় কমিটির প্রধান ধারণা করছেন যে প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য রক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান অধিগ্রহণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর কর্তৃক দেওয়া সিদ্ধান্ত হয়তো অজ্ঞতাপ্রসূত, অর্থাৎ ভূমির প্রকৃতি সম্বন্ধে না জেনে বা তা গোপন করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে!

একে আমরা কী বলব

যখন আবাসন প্রকল্পের নামে কোনো কোম্পানি কৃষকের জমিতে জোর করে বালি ফেলে, আমরা তাকে ভূমিদস্যুতা বলি। যখন সংবিধান, আইন ও আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে এবং প্রশাসনযন্ত্রকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাদের অবশিষ্ট পাহাড়ি বনে প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপন করতে চান, সে প্রক্রিয়াকে আমরা কী বলব? বঙ্গবন্ধুর নাম সম্পৃক্ত করে এ ধরনের একটি অবৈধ কার্যক্রম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রক্ষিত বনভূমি, জাতীয় উদ্যান ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য ভূমি বরাদ্দের সব প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে বেআইনি ও জনস্বার্থবিরোধী। এ প্রক্রিয়া স্থগিত করে বিকল্প স্থানে একাডেমি স্থাপন বা বিদ্যমান একাডেমি সম্প্রসারণের মাধ্যমেই অর্থবহ ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে বর্তমান ও ভবিষ্যতে প্রজন্মের জন্য পরিবেশ, বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে প্রদত্ত সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি।

লেখক:

সুলতানা কামাল, মানবাধিকারকর্মী

খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি

ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন

শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা এবং ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ, প্রধান নির্বাহী, ইয়েস।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন