শালবনে বসন্তের আমেজ

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিন্দুবাড়ির বেনুভিটা থেকে ১৯ মার্চ তোলা শালের ফুল
ছবি: লেখক

ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে দেশের বিলুপ্তপ্রায় শালবনগুলো মহাসংকটের মধ্য দিয়েই এখনো যৎসামান্য টিকে আছে। তার চেয়েও বিসংবাদ হলো, এই বনের প্রধান বৃক্ষ শালগাছ এখন সারা বিশ্বেই বিপন্ন।

এ ক্ষেত্রে বেশ কটি অন্তরায়ের মধ্যে অন্যতম হলো সাধারণত নিজস্ব আবাসের বাইরে শালগাছের বংশবৃদ্ধি ঘটে না। ক্রমাগত দখল, দূষণ, অগ্নিসংযোগ আর করাতের আঘাতে জর্জরিত শালবনগুলো নিজেদের ধ্বংসস্তূপের ভেতর এখনো জীবনের জয়গান গেয়ে চলেছে। চৈত্র মাসের এই তপ্ত হাওয়ায় বনের ভেতর পথ চলতে গিয়ে এ কথাই মনে হলো বারবার। মসৃণ কচি পাতার এক আবেগঘন রং ছড়িয়ে আছে চারপাশে। কোথাও কোথাও বন পোড়ানোর বীভৎস উৎসব লক্ষ করা গেল। নাদান ও অবিবেচক মানুষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তবু শালবনে বসন্ত নেমেছে। কচি পাতার সঙ্গে অজস্র ফুলের সমারোহে সুদৃশ্য এক বন অপার মুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছে। শুধু মুগ্ধতাই নয়, গুরুত্ব বিবেচনায় এই বন বিপুল সম্ভাবনারও। অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই শালবন। শুধু শাল বা গজারিগাছের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না।

শাল (Shorea robusta) বড় ধরনের পত্রমোচি বৃক্ষ। ২৫ থেকে ৩৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বেড় ৩ দশমিক ৫ মিটার এবং ওপরের দিকে প্রসারিত মুকুট। কাণ্ড ধূসর ও অমসৃণ। গুচ্ছবদ্ধ ফুলগুলো ধূসর বর্ণের। ফল পাঁচটি পাখাসহ সামারা (পক্ষযুক্ত অ্যাকিন) আকার। ফলগুলো এই পাখায় ভর করে চমৎকার ভঙ্গিতে ঘুরে ঘুরে নিচে পড়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ফুল হয়। ফল পাকে জুন মাসে। শীতকালে বেশির ভাগ গাছের পাতা ঝরে যায়। বসন্তে নতুন পাতা ও ফুলের সমারোহে ভরে ওঠে শালবন। গড়ন ও আকৃতির কারণে শালগাছের পাতা আলাদাভাবেই চেনা যায়। পাতা আয়তাকার, পুরু, গোড়া চওড়া ও আগা চোখা ধরনের। বোঁটাহীন ফুলগুলোর পাপড়ির সংখ্যা ৫। এই গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গাছের গোড়া থেকেই নতুন চারা গজায়। এ কারণে শালগাছের আরেক নাম গজারি। শালবনের ভেতরে মাঝারি ঘনত্বের লতাগুল্ম একধরনের নিবিড় আচ্ছাদন তৈরি করে রাখে। বর্ষাকালে মাটির দু-এক ফুট ওপরে বিভিন্ন ধরনের লতাগুল্মের ঠাসবুননে আরও ঘনবদ্ধ হয়ে ওঠে এই বন।

শাল কাঠ খুব মজবুত। রেলের স্লিপার, ঘরের কড়িবরগা, নৌকার ডেক ও ঘরের খুঁটির কাজে ব্যবহারের জন্য উত্তম। এ গাছের আঠা ধুনা নামে পরিচিত। ধুনা আগুনে ফেললে যে ধোঁয়া বের হয়, তা জীবাণুনাশক ও সুগন্ধযুক্ত। এই গাছ চমৎকার ঔষধি গুণসম্পন্নও। কর্মহীন অলসতায় শরীর স্থূলকায় হলে ২৫ গ্রাম পরিমাণ কচি শাল কাঠ ভালোভাবে থেঁতো করে চার-পাঁচ কাপ পানিতে সেদ্ধ করে দেড় কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে ওই নির্যাসটুকু সকাল-বিকেল সমানভাগে খেতে হবে। শালপাতায় বিদ্যমান রেজিন কৃমিনাশক। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট, আমাশয়, ফোড়া ও চর্মরোগে শালপাতা, ধুনা ও বাকল বেশ কার্যকর।